উচ্ছেদ করে সামনে এগোচ্ছিল পুলিশ, পেছনেই আবার দখল ফুটপাত

· Prothom Alo

সকাল সাড়ে ১০টা। রাজধানীর শ্যামলীর রিং রোড এলাকার সড়ক ও ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা; আর পেছনেই আবার দখল হচ্ছিল সড়ক ও ফুটপাত। ফিরছিল পুরোনো চেহারা।

Visit h-doctor.club for more information.

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিনিয়র সিভিল জজ) মো. আল-ফয়সালের নেতৃত্ব এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে উচ্ছেদ অভিযান চলে বেলা ২টা পর্যন্ত।

কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার আগেই ফুটপাতে ফিরে আসে পুরোনো সেই বিশৃঙ্খলা। উচ্ছেদ অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যরা যখন রিং রোডের অপর প্রান্ত শিয়া মসজিদের সামনে, তখনই পেছনের অংশের ফুটপাত ফেরে আগের চেহারায়। যেন সেখানে কিছুই ঘটেনি।

অভিযান থেকে বাঁচতে অনেকে দোকানে তালা লাগিয়েছিলেন। কেউ কেউ ফুটপাতে থাকা স্থাপনা সরিয়ে রেখেছিলেন; কিন্তু পুলিশ সামনে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সবাই আবার ফুটপাত দখলে নেন। খাবারের দোকান বসানো থেকে শুরু করে চলছিল তরমুজ স্তূপ করে বিক্রি।

রিং রোডের বাইতুস সালাম মসজিদের পাশে ফুটপাতে থাকা একটি দোকান বেলা একটার দিকে পুলিশ উচ্ছেদ করে। ওই দোকানে চা–শিঙাড়া, পরোটাসহ বিভিন্ন ভাজাপোড়া বিক্রি হয়। অভিযানের সময় পুলিশ দোকানটি উঠিয়ে দেয়। ক্রেন দিয়ে দোকানের সাইনবোর্ড ও ছাউনিও ভেঙে দেওয়া হয়; কিন্তু পুরো অভিযান শেষ হওয়ার আগেই ফুটপাত দখল করে আবার ওই দোকানে বেচাকেনা শুরু হয়।

এমন দৃশ্য পুরো এলাকাতেই দেখা গেছে। অভিযানে থাকা দলটি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দোকানিরা আবার ফুটপাত ও সড়ক দখল করে নেন। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো এলাকা ফিরে যায় আগের চেহারায়।

‘কোথায় যাব স্যার’

সকাল সাড়ে ১০টায় রিং রোডে আড়ং শ্যামলী আউটলেটের পাশে একটি অস্থায়ী চায়ের দোকানে অভিযান চালায় পুলিশ। এই দোকানের মালিকের নাম আসমা বেগম। বাড়ি যশোর। অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার পর আসমা বেগম মালামাল সরিয়ে নেন।

কিন্তু পরিবারে ভরণপোষণ নিয়ে আতঙ্ক তখন আসমার চোখেমুখে। আসমা বেগমের এক ছেল মানসিক প্রতিবন্ধী। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। তাই ছেলের চিকিৎসা ও ভরণপোষণের খরচ তাঁকে জোগাতে হয়।

আসমা বেগম দোকান উচ্ছেদ না করার জন্য পুলিশের কাছে বারবার অনুরোধ করছিলেন। বলছিলেন, ‘স্যার কোথায় যাব? আমার স্বামী নেই। একটা ছেলে প্রতিবন্ধীর মতো। একটু বিবেচনা করেন।’

পুলিশ সামনে চলে যাওয়ার পর শ্যামলীর রিং রোডের বাইতুস সালাম মসজিদের পাশের দোকানটি আবার চালু হয়। ঢাকা; ২ এপ্রিল ২০২৬

অপরিকল্পিত উদ্যোগ

উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্বে থাকা স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-ফয়সালের কাছে প্রথম আলো জানতে চায়, ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা আবারও বসবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আজ অভিযান পরিচালনা করছি। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা হবে।’

এ সময় সড়ক ও ফুটপাত স্বাভাবিক রাখতে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানাননি এই ম্যাজিস্ট্রেট।

এ ধরনের অপরিকল্পিত অভিযান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শ্যামলী এলাকার দোকানি ও পথচারীরা। তাঁরা মনে করছেন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা এলে মাঝেমধ্যে এমন অভিযান পরিচালনা করা হয়; কিন্তু এর কোনো সুফল মানুষ পায় না। সাময়িক অভিযান চালানো হলেও সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

রিং রোড এলাকার ব্যবসায়ী মো. বাশেত প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ অভিযানের ঘোষণা আগেই দিয়েছে। তাই অবৈধ স্থাপনা তেমন নেই; কিন্তু বিকেলের পর এই রাস্তায় হাঁটা দায় হয়ে যায়। রাতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। কাজেই অভিযানের পর সেটির ধারাবাহিকতা রাখতে না পারলে কোনো পরিবর্তন হবে না।

রিং রোড হয়ে নিয়মিত শেখেরটেকের বাসায় যাতায়াত করেন আসাদ হোসেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কর্মস্থল মহাখালী। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পর বেলা দুইটায় কথা হয় আসাদের সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এক ঘণ্টা পার হয়নি উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন; অথচ দেখেন কোনো চিহ্ন নেই। আগের মতোই রাস্তা দখল হয়ে আছে।’

উচ্ছেদ অভিযানের এক ঘণ্টার মাথায় শ্যামলী ক্লাব মাঠের পাশের ফুটপাতে চলছে তরমুজ বিক্রি। ঢাকা; ২ এপ্রিল ২০২৬

অভিযান চলবে

মোহাম্মদপুরের রিং রোড, তাজমহল রোড, সলিমুল্লাহ রোড ও সওজ রোড এলাকায় বৃহস্পতিবার অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল পুলিশ; কিন্তু বেলা দুইটায় রিং রোড এলাকায় অভিযান শেষ করে। পরে পুলিশ জানায়, রিং রোড এলাকা বড় হওয়ায় সময় বেশি লেগেছে। তাই বাকি এলাকায় আগামী শনিবার ফের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

অভিযান পরিচালনার পর ফের যেসব দোকান বসেছে, তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার কথা জানান উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেওয়া ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অভিযান নিয়মিত চলবে। কাজেই যারা আবার ফুটপাত দখলে নিয়েছে, মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে; পরবর্তী অভিযানে তাদের প্রতি কঠোর আচরণ করা হবে। প্রথম দিন হওয়ায় আজ আমরা কোমল আচরণ করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে আর কোমল আচরণ করা হবে না।’

Read full story at source