৬ শিল্পগোষ্ঠীর ‘পাচার করা’ টাকা খুঁজতে ৩৬ চুক্তি

· Prothom Alo

দেশের বড় ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর ‘পাচার করা’ অর্থ ও বিদেশে তাদের সম্পদ খুঁজতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে বহুজাতিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি বা নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে দেশের ১০টি ব্যাংক। মোট চুক্তি হবে ৫৯টি। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন।

Visit milkshakeslot.lat for more information.

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়ে পড়েছে, তাদের মধ্যে ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যাংকগুলো এই চুক্তি করেছে। এনডিএর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অর্থ উদ্ধারে বাণিজ্যিক চুক্তি করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। কাজটির সমন্বয় করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ব্যাংক দখল, লুটপাট, আর্থিক অনিয়মসহ নানা অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে এসব শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে। তাদের কারণে ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংক একীভূত করতে হচ্ছে। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না আরও কয়েকটি ব্যাংক।

ছয় শিল্প গ্রুপ হলো চট্টগ্রামের মোহাম্মদ সাইফুল আলমের এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপ, প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ ও নাসা গ্রুপ। আওয়ামী লীগের মেয়াদে টানা ১৫ বছর ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান ছিলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার, যিনি নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান।

ব্যাংক দখল, লুটপাট, আর্থিক অনিয়মসহ নানা অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে এসব শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে। তাদের কারণে ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংক একীভূত করতে হচ্ছে। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না আরও কয়েকটি ব্যাংক।

ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর মোট ঋণ ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। ফলে পুরো ব্যাংক খাত আস্থার সংকটে ভুগছে।

পাচার করা অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে পড়েছে এবং বিদেশে টাকা পাচারের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে, শুধু তাদের অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে আপাতত নজর দেবে ব্যাংকগুলো। যাদের ঋণ নিয়মিত ও ব্যবসা চলমান আছে, তাদের বিষয়ে এখনই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। বিশেষ সুবিধায় ঋণ নবায়ন করা ব্যবসায়ীদের এক কিস্তি খেলাপি হলে তাদের বিষয়ে খোঁজ করা শুরু হবে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনডিএর সই হয়েছে, তারা মূলত বহুজাতিক আইনি ও ব্যবসায়িক পরামর্শ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান পাচার করা অর্থ উদ্ধারেও কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধার করতে পারলে তার একটি অংশ পাবে সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে অর্থ উদ্ধারে আলাদা কোনো খরচ হবে না দেশের ব্যাংকগুলোর। একাধিক আইনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অর্থ উদ্ধার করে দিতে ইতিমধ্যে ঢাকা সফর করেছেন এবং কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন সরকারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

পরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে টাকা পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ‘যৌথ তদন্ত দল’ গঠন করা হয়। এর নেতৃত্বে আছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সদস্য হিসেবে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আইন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে সহায়তা দিচ্ছে।

যে ১১টি শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছিল, তার মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপ। এসব গ্রুপের পাশাপাশি মালিকদের ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়। এসব গ্রুপ দেশে ব্যাংক ও অন্য ব্যবস্থা থেকে কত সম্পদ অর্জন করেছে এবং দেশে-বিদেশে কত সম্পদ আছে, তা সংগ্রহ করে যৌথ তদন্ত দল। তাদের সবার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা করেছে দুদক। দেশে ও বিদেশে থাকা তাদের অনেকের সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে তদন্ত হলেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সের বৈঠকে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অর্থ পাচারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে দেওয়ানি কার্যধারা শুরু করার জন্য ৬টি গ্রুপকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হয়। ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর কাছে থাকা মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশই এই ছয় গ্রুপের। এ জন্য ছয় গ্রুপের তথ্য খুঁজে বের করতে এনডিএ করার সিদ্ধান্ত হয়।

এসব গ্রুপ দেশে ব্যাংক ও অন্য ব্যবস্থা থেকে কত সম্পদ অর্জন করেছে এবং দেশে-বিদেশে কত সম্পদ আছে, তা সংগ্রহ করে যৌথ তদন্ত দল। তাদের সবার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা করেছে দুদক। দেশে ও বিদেশে থাকা তাদের অনেকের সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

কোন ব্যাংকের টাকা ‘পাচার’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে গত ১০ মার্চ একটি সভা হয়। এতে পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা যোগ দেন।

সভায় জানানো হয়, সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক মানের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ এখন সমান্তরাল আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে অপরাধীকে দেশে বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি বিদেশে তাঁর পাচার করা সম্পদ শনাক্ত ও বাজেয়াপ্ত করার দেওয়ানি প্রক্রিয়াও সমানতালে চলবে।

সভায় তুলে ধরা হয়, এস আলম গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম। এ ছাড়া একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পাশাপাশি জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, কমার্স ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পগোষ্ঠীটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এ টাকার বড় অংশ তারা পাচার করেছে।

সাইফুল আলম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নাগরিকত্ব ত্যাগ-সংক্রান্ত আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। একাধিক দেশে এস আলমের হোটেল ও সম্পদের খোঁজ পেয়েছে বিএফআইইউ। এখন এস আলমের সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংককে। এস আলমের অর্থ উদ্ধারে ১০টি এনডিএ স্বাক্ষরিত হবে। ইতিমধ্যে তিনটি এনডিএ সম্পন্ন হয়েছে।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পাশাপাশি জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, কমার্স ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পগোষ্ঠীটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এ টাকার বড় অংশ তারা পাচার করেছে।

ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খাঁন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এস আলমের বিদেশের সম্পদের খোঁজে আমরা ইতিমধ্যে বহুজাতিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি। তথ্য পাওয়ার পর আমরা অর্থ উদ্ধারে চুক্তি করব। এর মাধ্যমে গ্রুপটির প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণের একটা অংশ আদায়ের আশা করছি।’

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুকমিলা জামান। ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও এসবিএসি ব্যাংকও ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পাচারকৃত সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে ইউসিবি, আল-আরাফাহ্‌ ও ইসলামী ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছয়টি এনডিএ করেছে ইউসিবি।

ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খাঁনএস আলমের বিদেশের সম্পদের খোঁজে আমরা ইতিমধ্যে বহুজাতিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি। তথ্য পাওয়ার পর আমরা অর্থ উদ্ধারে চুক্তি করব। এর মাধ্যমে গ্রুপটির প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণের একটা অংশ আদায়ের আশা করছি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণের প্রায় পুরোটা খেলাপি হয়ে গেছে এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরী সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ জব্দ করেছে দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। লন্ডনে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী ইমরানা জামান চৌধুরী তিনটি বিলাসবহুল স্থাপনার মালিকানা পরিবর্তন করেছেন। এর মূল্য প্রায় তিন কোটি পাউন্ড (প্রায় ৪৯০ কোটি টাকা)।

বেক্সিমকোর ‘পাচার করা’ সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব পড়েছে জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর। বেক্সিমকোর সম্পদের খোঁজে ১১টি এনডিএ করবে ব্যাংক দুটি। ইতিমধ্যে ৯টি সই হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই খেলাপি। পাশাপাশি আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইউসিবি, পদ্মা ব্যাংক, ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও একীভূত পাঁচ ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা, যার বড় অংশ খেলাপি।

বেক্সিমকোর ‘পাচার করা’ সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব পড়েছে জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর। বেক্সিমকোর সম্পদের খোঁজে ১১টি এনডিএ করবে ব্যাংক দুটি। ইতিমধ্যে ৯টি সই হয়েছে।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এর মাধ্যমে বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণের একটা অংশ আদায় করা সম্ভব হবে।’

সিকদার গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটি দেড় দশক ছিল সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া আরও ক্ষতির মুখে পড়েছে একীভূত পাঁচ ব্যাংক, এবি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক। যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে রয়েছে সিকদার পরিবারের একাধিক কোম্পানি ও বিপুল বিনিয়োগ। পাচার করা অর্থ উদ্ধারে দায়িত্ব পড়েছে আইএফআইসি ও অগ্রণী ব্যাংকের ওপর। ৯টি এনডিএর সব কটিই সম্পন্ন করেছে ব্যাংক দুটি।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান ইতিমধ্যে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এর মাধ্যমে বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণের একটা অংশ আদায় করা সম্ভব হবে।

সিকদার গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এই ঋণের প্রায় সবটাই খেলাপি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।

নাসা গ্রুপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একীভূত পাঁচ ব্যাংক। গ্রুপটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার নিজেই ছিলেন এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এ ছাড়া আরও ক্ষতিতে পড়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, পূবালী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। পাচার করা অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব পড়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আল–আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের ওপর। তাদের সম্পদের খোঁজে ১২টি এনডিএ করবে ব্যাংক দুটি, সম্পন্ন করেছে ৮টি।

নাসা গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এই ঋণের প্রায় পুরোটাই খেলাপি বলে জানা গেছে ব্যাংক সূত্রে।

জানতে চাইলে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক আমরা তথ্যের জন্য চুক্তি করেছি। এরপর বাণিজ্যিক চুক্তি হবে। আমরা আশাবাদী এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটা অংশ আদায় করা যাবে।’

ওরিয়ন গ্রুপের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক। অর্থ উদ্ধারে দায়িত্ব পেয়েছে অগ্রণী ব্যাংক ও ইউসিবি। তাদের পাচার করা সম্পদের খোঁজে ১০টি এনডিএ করবে ব্যাংক দুটি, সম্পন্ন হয়েছে একটি।

২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে ১১টি গ্রুপ নিয়ে তদন্তের বিষয়ে তৈরি করা একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওরিয়ন ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা।

আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনবাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক আমরা তথ্যের জন্য চুক্তি করেছি। এরপর বাণিজ্যিক চুক্তি হবে। আমরা আশাবাদী এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটা অংশ আদায় করা যাবে।

একই প্রতিবেদনে বসুন্ধরা গ্রুপের ঋণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, নাবিল গ্রুপের ৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা, জেমকন গ্রুপের ২ হাজার ১১৩ কোটি টাকা এবং সামিট গ্রুপের ঋণ ১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। প্রিমিয়ার গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

তদন্ত ও টাকা খুঁজতে চুক্তির বিষয়ে ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর বক্তব্য জানতে তাদের ই-মেইল করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব গ্রুপের কর্ণধারদের কেউ কারাগারে, আবার কেউ বিদেশে পলাতক রয়েছেন।

অন্য পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে দুটির বক্তব্য পাওয়া গেছে। সামিট কর্তৃপক্ষ প্রথম আলোকে দেওয়া লিখিত বিবৃতিতে বলেছে, তারা দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করছে, এই প্রতিষ্ঠান বা এর শেয়ারধারীরা কখনো কোনো ধরনের অবৈধ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তা বাংলাদেশে হোক কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে। বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষই তাঁদের এমন কোনো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। সব সময় তাঁদের পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ছিল, যেকোনো পর্যালোচনা বা অনুসন্ধানে প্রমাণিত হবে, সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ আর্থিক অনিয়মের কোনো অভিযোগেরই কোনো ভিত্তি নেই।

নাবিল গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমাদের কোম্পানির নামে ব্যাংকগুলোতে যত ঋণ রয়েছে, তা সব নিয়মিত আছে। আমার ব্যবসা ভালো চলছে। আমি সব ঋণ শোধ করতে বাধ্য।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে ‘প্লি বার্গেইন’–এর (মামলার একটি সমঝোতামূলক প্রক্রিয়া) অংশ হিসেবে সাজা কমানোর সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণ, সবার জন্য সমান মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে।

‘অর্থ ফেরত আনা অসম্ভব নয়’

বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা কঠিন, তবে অসম্ভব নয় বলে মনে করেন এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে অর্থ উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেই দেশগুলোর আদালতে তা প্রমাণ করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ। তবে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা অসম্ভব নয়।

টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের সঙ্গে সমঝোতার একটি চিন্তাও আছে সরকারের ভেতরে। সে বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে ‘প্লি বার্গেইন’–এর (মামলার একটি সমঝোতামূলক প্রক্রিয়া) অংশ হিসেবে সাজা কমানোর সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণ, সবার জন্য সমান মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে। অন্যথায় পাচারের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব‍্যাংকগুলো বাস্তবে অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশে আরও এক দফা অপরাধের সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ নিতে পারে। বিনিময়ে রাষ্ট্র কিছুই পাবে না। অপরাধীরা ‘হিরো’ (নায়ক) হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবেন।

Read full story at source