এআই হাইপ, ভবিষ্যদ্বাণী ও অদৃশ্য প্রতারণার রাজনীতি
· Prothom Alo

আজ যে বিষয় নিয়ে লিখছি, সেটাই আমার জীবনযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু; আমার পেশার শাণিত শৃঙ্খলা ও নেশার দাহ্য কৌতূহল। প্রযুক্তি কেবল একটি যন্ত্র বা অ্যালগরিদমের সমষ্টি নয়, বরং এটি মানবসমাজের ভাবনা, ভাষা, অর্থনীতি এবং নৈতিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত এক চলমান প্রক্রিয়া। তাই যখন দেখি কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রযুক্তিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার বদলে তাকে ধোঁয়াশায় ঢেকে মুনাফার অস্ত্র বানাচ্ছে, তখন এর ভ্রান্তি উন্মোচন করা শুধু পেশাগত দায়িত্বই থাকে না, নৈতিক দায় হয়েও দাঁড়ায়।
প্রযুক্তির ইতিহাস প্রমাণ করে, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার অভাবে যেকোনো আবিষ্কারই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার খেলায় রূপ নেয়; যেখানে জনগণের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয় নতুন শোষণের কাঠামো। আর এ কারণেই সচেতনতা তৈরির জন্য লিখতে হয়, যাতে সাধারণ নাগরিকেরা বুঝতে পারেন মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক বা জেনারেটিভ মডেলের আসল সীমা ঠিক কোথায়, কোন অংশটুকু কেবলই অলীক প্রতিশ্রুতি বা ফাঁকা বুলি। মিথ্যা প্রত্যাশা মানুষকে যেমন সহজে প্রলুব্ধ করে, তেমনি শিক্ষাও প্রমাণ করে যে সমালোচনামূলক চিন্তা ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বদাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
Visit truewildgame.com for more information.
এই লেখালেখির মধ্য দিয়েই আমি চাই, সমাজে একধরনের গণজবাবদিহি ও সতর্কতা তৈরি হোক; যাতে আমরা হাইপকে হাইপ বা অতিরিক্ত প্রচারণা হিসেবেই চিনতে পারি এবং প্রযুক্তিকে দেখতে পারি তার প্রকৃত রূপে, যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমাবদ্ধ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাসকে প্রযুক্তির সামগ্রিক বিকাশ থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা যায় না; এর শিকড় প্রাচীনকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। অ্যাবাকাসের মতো আজ আমরা যেসব যন্ত্রকে এআই বলি, সেগুলো আমাদের আনুষ্ঠানিক ও মানসিক দক্ষতাগুলোকেই অনুকরণ ও স্বয়ংক্রিয় করে তোলে, তবে আরও ব্যাপক স্তরে।
সৃজনশীলতায় মানুষকে ছাড়িয়ে গেল এআই!প্রযুক্তির ইতিহাস প্রমাণ করে, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার অভাবে যেকোনো আবিষ্কারই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার খেলায় রূপ নেয়; যেখানে জনগণের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয় নতুন শোষণের কাঠামো।
আনুষ্ঠানিকভাবে এআই গবেষণা শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রতীকভিত্তিক ধারা দিয়ে। এ ধারার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ক্ষমতা। যেমন যুক্তি, জ্ঞান, অস্তিত্বতত্ত্ব ও অর্থতত্ত্বকে সফটওয়্যারের কাঠামোর ভেতরে প্রোগ্রাম করা। কিন্তু কাজটি যতটা সহজ মনে হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বৃহত্তর ক্ষেত্রে অদম্য আশাবাদ থাকা সত্ত্বেও এই প্রতীকভিত্তিক পদ্ধতি নানা লজিস্টিক ও ধারণাগত সীমাবদ্ধতায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে এর অগ্রগতি অনেকটাই থমকে যায়।
এরপর মেশিন লার্নিং নামে প্রতিদ্বন্দ্বী পদ্ধতিটি এমন সব অ্যালগরিদম তৈরি করল, যা সাধারণ শক্তি-নির্ভর অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে মনে হলো যেন মানবমনের কিছু মৌলিক কার্যক্রমকে পুনরুৎপাদন করছে। শুরুতে এই ধারাও আটকে ছিল তথ্যের স্বল্পতা ও সীমিত কম্পিউটিং ক্ষমতার কারণে। কিন্তু নতুন সহস্রাব্দে এসে সেই প্রতিবন্ধকতা ভেঙে যায়। কারণ, ইন্টারনেট বিপুল পরিমাণ তথ্য সঞ্চয় করে ফেলেছিল। গ্রাফিক প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ নামে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি, যা সাধারণত ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও গেম কনসোলে ব্যবহৃত হতো। এতে প্রমাণিত হলো যে মেশিন লার্নিং মডেলের জন্য প্রয়োজনীয় তীব্র কম্পিউটেশন সম্পাদনে সেটি অত্যন্ত কার্যকর।
মেশিন লার্নিং এমন অ্যালগরিদম তৈরি করল, যা শক্তিনির্ভর অপ্টিমাইজেশন ব্যবহার করে যেন মানবমনের কিছু মৌলিক কাজ অনুকরণ করতে পারে২০১১ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালেক্স ক্রিজেভস্কি, ইলিয়া সুতসকেভার এবং জিওফ্রে হিন্টন একধরনের নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বহুল আলোচিত ইমেজনেট প্রতিযোগিতা। এটি ছিল স্বয়ংক্রিয় চিত্র-বর্ণনার একটি ক্ষুদ্র প্রতিযোগিতা। একে তখন অনেক এআই গবেষকই তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতেন। কিন্তু তাঁদের মডেলটি ছবিগুলোকে ৮৫ শতাংশ নির্ভুলতায় বর্ণনা করেছিল। সেটা ছিল আগের যেকোনো প্রচেষ্টার তুলনায় বিরাট অগ্রগতি।
অল্প সময়ের মধ্যেই এআই গবেষণার বেশিরভাগ সম্পদ পুনর্নির্দেশিত হলো এই অবহেলিত উপশাখায়। যার পরিণতিতে গড়ে উঠল আজকের সেই নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো। সেটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন ও ই-কমার্সকে চালিত করে। একইসঙ্গে ভোক্তাদের জন্য এক নতুন প্রজন্মের পণ্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে কে, মানুষ নাকি এআইমেশিন লার্নিং নামে প্রতিদ্বন্দ্বী পদ্ধতিটি এমন সব অ্যালগরিদম তৈরি করল, যা সাধারণ শক্তি-নির্ভর অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে মনে হলো যেন মানবমনের কিছু মৌলিক কার্যক্রমকে পুনরুৎপাদন করছে।
২০১৫ সালে ওপেনএআই নামে একটি অপরিচিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন ইলিয়া সুতসকেভার, ইলন মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানসহ আরও কয়েকজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। সাত বছর পর প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ করে চ্যাটজিপিটি। কিন্তু পণ্যটির বিপুল সাড়া পেয়ে ওপেনএআই নিজেই হতচকিত হয়ে পড়ে। কারণ তারা আগেভাগে এত মানুষের জন্য যথেষ্ট কম্পিউটিং ক্ষমতা সুরক্ষিত করতে পারেনি।
ঘটনাটি মাত্র তিন বছর আগের। কিন্তু আজ পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে গেছে। জেনারেটিভ এআই এখন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ওপেনএআইয়ের অনুমানভিত্তিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি!
এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই যে প্রযুক্তির সংক্ষিপ্ত এই বিবরণ ইতিহাসের খামখেয়ালিপনাকেই প্রকাশ করছে। তবু একটি জনপ্রিয় কল্পনা এই ইতিহাসকে অনেক সহজভাবে সাজায়। তা যেন কম্পিউটিংয়ের ইতিহাস সাফল্য ও হঠাৎ উদ্ভাসিত জ্ঞানের এমন একটি চিত্রনাট্য, যেখানে অগ্রগতি খুবই স্বাভাবিক, তুচ্ছ ও ধাপে ধাপে ক্রমবর্ধমান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী অরবিন্দ নারায়ণন ও সায়াশ কাপুরের লেখা বই এআই স্নেক অয়েলআমি ইঙ্গিত করছি এআইকে ঘিরে গড়ে ওঠা সেই প্রচারণার দিকে; যাকে বলা যায় শিল্পকেন্দ্রিক উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ। সেটা সমাজের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং একধরনের সাংস্কৃতিক উন্মাদনা উসকে দিতে উদ্যত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী অরবিন্দ নারায়ণন ও সায়াশ কাপুর এআই স্নেক অয়েল বইটি লিখেছেন মূলত সাধারণ নাগরিকদের সহায়তার জন্য। এর মাধ্যমে তাঁরা সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করে কোনো কথিত অগ্রগতি আসলেই বিশ্বাসযোগ্য কি না, তা বিচার করতে পারেন। সেইসঙ্গে বের হতে পারেন এআইকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রচারণার ফাঁদ থেকে। তাঁরা জেনারেটিভ এআইয়ের বাস্তব ও অসাধারণ অগ্রগতিকে অস্বীকার করছেন না। তবুও এর ব্যাপক ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতার সামাজিক পরিণতি নিয়ে তাঁরা গভীরভাবে চিন্তিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে হতাশাবাদী।
এআই কেন এআইয়ের লেখা ধরতে পারে নাযুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী অরবিন্দ নারায়ণন ও সায়াশ কাপুর এআই স্নেক অয়েল বইটি লিখেছেন মূলত সাধারণ নাগরিকদের সহায়তার জন্য।
তাঁদের মতে, সমস্যার বড় একটি অংশ তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি থেকে; যা আজকের বাণিজ্যিক এআই উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এবং তাকে টিকিয়ে রেখেছে। যেমন, মিশন ইমপসিবল, অ্যাটলাস কিংবা দ্য ক্রিয়েটির মুভিতে হলিউডের বিদ্রোহী এআইকে ঘিরে নতুন যে মোহ তৈরি হয়েছে। অথবা বাজারে হুড়োহুড়ি লেগেছে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, হিউমিডিফায়ারসহ নানা দৈনন্দিন যন্ত্রে এআই লেবেল লাগানোর জন্য। এমনকি স্পটিফাই ও ইউটিউবের বহু পুরোনো অ্যালগরিদম পর্যন্ত এখন এআইয়ের নামে চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতি আবার দেখা যাচ্ছে, কিছু পরিষেবা নামমাত্র মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কিংবা মোটেও ব্যবহার না করে জনসাধারণের মধ্যে এআইয়ের পরিচয় ও ক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
নারায়ণন এবং কাপুর বিশেষভাবে চিন্তিত জেনারেটিভ এআই ও প্রেডিক্টিভ এআইয়ের বিভ্রান্তি নিয়ে। জেনারেটিভ এআই মানুষের ইনপুটের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়বস্তু তৈরি করে। আর প্রেডিক্টিভ এআই দাবি করে যে এটি ভবিষ্যতের ফলাফল সঠিকভাবে অনুমান করতে পারবে। হোক তা কোনো চাকরিপ্রার্থীর সাফল্য কিংবা কোনো দেশে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই-ভিত্তিক পণ্যগুলো এখনো অপরিণত, অবিশ্বস্ত এবং সহজেই অপব্যবহারযোগ্য। আর প্রেডিক্টিভ এআইকে তাঁরা আরও কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এটি আজও কার্যকর নয়, ভবিষ্যতেও সম্ভবত কখনো কার্যকর হবে না। কিন্তু প্রচারণার ঝড়ে এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো মুছে গেছে। তা সুযোগ করে দিয়েছে নানা প্রতারক ও ভুয়া বুদ্ধিজীবীদের; যাঁরা মিথ ও ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে জনসাধারণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।
ইতিহাসে ব্যবসা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আশাবাদ বা প্রচারণা নতুন কিছু নয়। তবে এ ঢেউয়ের ব্যাপকতা ও তীব্রতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সেটা প্রতিফলিত হচ্ছে প্রযুক্তিগত ভবিষ্যদ্বাণীমূলক গ্রন্থগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রকাশনার মধ্য দিয়ে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রে কার্জওয়েলের দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ারার, ইউভাল নোয়া হারারির নেক্সাস এবং সাবেক মাইক্রোসফট নির্বাহী ক্রেইগ মুন্ডি, সাবেক গুগল সিইও এরিক শ্মিট এবং প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জারের যৌথ রচনা জেনেসিস।
এআই কি মানুষের বলা মিথ্যা ধরতে পারবেজেনারেটিভ এআই মানুষের ইনপুটের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়বস্তু তৈরি করে। আর প্রেডিক্টিভ এআই দাবি করে যে এটি ভবিষ্যতের ফলাফল সঠিকভাবে অনুমান করতে পারবে।
অনেক এআই-ভবিষ্যদ্বক্তার এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা প্রযুক্তিটি সম্পর্কে নিজেরাও তেমন ভালোভাবে জানেন না! ২০১৫ সালে হোমো ডিউস প্রকাশের পর সামরিক ইতিহাসবিদ হিসেবে প্রশিক্ষিত হারারি আবিষ্কার করেন, তিনি নাকি এআই-বিশেষজ্ঞ হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন!
তাঁর পরের বই নেক্সাস-এর লক্ষ্য ছিল এআই বিপ্লবের আরও সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করা। কিন্তু বইটি পড়লে মনে হয় এটি আসলে একজন স্নাতক শিক্ষার্থীর ভুলভাল বই, যেখানে রয়েছে শ্রেণিভ্রান্তি আর জোর করে তথ্য গুঁজে দেওয়ার এক ব্যর্থ কসরত।
মেশিন লার্নিং বোঝাতে গিয়ে হারারি বেবি অ্যালগরিদমের প্রি-ট্রেনিংকে জীবন্ত শিশুদের শৈশবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেটা এই প্রযুক্তি বোঝানোর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণগুলোর একটি। মানুষের শেখার পদ্ধতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের যতটুকু জানা আছ, তা মোটেই মেশিন লার্নিংয়ের মতো নয়।
হারারি লেখা বই নেক্সাসতবু নিরুৎসাহিত না হয়ে হারারি জোর দিয়ে বলেছেন, মডেলগুলো নাকি নিজেদের নতুন কিছু শেখাতে সক্ষম। তিনি উদাহরণ দিয়েছেন আজকের দাবাড়ু এআইয়ের, যাকে খেলার মৌলিক নিয়ম ছাড়া আর কিছু শেখানোই হয়নি! অথচ বিশ্বের সবচেয়ে সফল দাবা-ইঞ্জিন স্টকফিশে অসংখ্য মানবকৌশল প্রোগ্রাম করে দেওয়া আছে।
হারারি এটি ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে মেশিন লার্নিং মডেলগুলো মূলত নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের একটি টেমপ্লেট বা ছাঁচ তৈরি করে, আর এই সমস্যা ও সমাধানের কাঠামো সম্পূর্ণভাবে প্রকৌশলীরাই তৈরি করে দেন। ফলে এই মডেলগুলো আসলে মানবীয় বিচারবুদ্ধি ও জ্ঞানের জটিল কাঠামোর ভেতরেই আবদ্ধ থাকে, যা তারা কোনো দিন অতিক্রম করতে পারে না।
সবাই কেন এআই পছন্দ করে নামেশিন লার্নিং বোঝাতে গিয়ে হারারি বেবি অ্যালগরিদমের প্রি-ট্রেনিংকে জীবন্ত শিশুদের শৈশবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেটা এই প্রযুক্তি বোঝানোর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণগুলোর একটি।
এভাবে বারবার হারারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত সরল ধারণাগুলোকেই গুলিয়ে ফেলেন। উদাহরণস্বরূপ, দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের অ্যালাইনমেন্ট প্রবলেম এআই আলোচনার এক মূল উপাদান। এটি একটি সাধারণ চিন্তা, যেখানে দেখানো হয় কীভাবে এআই মানব-লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে এমন কোনো উপায় বেছে নিতে পারে, যা তার নির্মাতাদের বৃহত্তর স্বার্থের বিরোধী। যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সময় কাটানোর পরিমাণ সর্বাধিক করতে গিয়ে এআই হয়তো তাঁদের বীভৎস, মিথ্যা বা রাজনৈতিকভাবে চরমপন্থী কনটেন্ট দেখাতে পারে।
কিন্তু হারারি একে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, অ্যালাইনমেন্ট প্রবলেম আসলে এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব। আর তাই তিনি এটি প্রয়োগ করেছেন এমন সব ঐতিহাসিক ঘটনায়, যেখানে বাস্তবে এআইয়ের কোনো ভূমিকাই ছিল না। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ; যেখানে স্বল্পমেয়াদি সামরিক লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য ভিন্নমুখী হয়ে পড়েছিল। অথচ বোস্ট্রমের সতর্কবার্তা শর্টসাইটেডনেস বা অদূরদর্শিতা নিয়ে নয়, বরং এমন লংসাইটেডনেস নিয়ে। তা মধ্যবর্তী ধাপে অমানবীয় সিস্টেমের ক্ষতিকর ভূমিকা একেবারেই দেখতে পায় না।
কিছু ক্ষেত্রে এই অজ্ঞতা কৌশলগত বলেই মনে হয়। হারারি কমপাস (কারেকশনাল অফেন্ডার ম্যানেজমেন্ট প্রোফাইলিং ফর অল্টারনেটিভ স্যাঙ্কশনস) সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করেছেন। এটি একটি মেশিন লার্নিং টুল, যা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের আদালতে অভিযুক্তের পুনরায় অপরাধ করার সম্ভাবনার স্কোর করতে ব্যবহৃত হয়েছে। হারারি সঠিকভাবেই দেখিয়েছেন, কমপাসের ব্যবহার এক প্রকার কেলেঙ্কারি, যেখানে অস্বচ্ছ অ্যালগরিদম গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতাকে বিপন্ন করছে।
কিন্তু তিনি এই সিস্টেমের সবচেয়ে মৌলিক ত্রুটির কথাটিই উল্লেখ করেননি! নারায়ণন এবং কাপুরের ভাষায়, ‘টুলটি শুরু থেকেই খুব বেশি নির্ভুল ছিল না; এর আপেক্ষিক নির্ভুলতা ছিল মাত্র ৬৪ শতাংশ; যা শুধু একটি কয়েন টস করার চেয়ে সামান্য ভালো। তাঁদের মতে, এই সংখ্যাটিও সম্ভবত অতিমূল্যায়িত, যদিও কমপাসের মালিক প্রতিষ্ঠান ও কিছু গবেষক এই মূল্যায়নকে বিতর্কিত বলে দাবি করেছেন।
হারারির এই অবহেলা সত্যিই বিস্ময়কর। বিশেষত তাঁর প্রযুক্তি-বিরোধী অবস্থান, তাঁর উদ্ধৃত ক্রিমিনাল জাস্টিস গবেষণা এবং তাঁর উল্লেখিত প্রোপাবলিকার কমপাসবিষয়ক অনুসন্ধানের কথা বিবেচনা করলে; যা নারায়ণন ও কাপুরও ব্যবহার করেছেন।
নিরাপত্তা এড়িয়ে মারাত্মক জীবাণু বানাচ্ছে এআই!সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সময় কাটানোর পরিমাণ সর্বাধিক করতে গিয়ে এআই হয়তো তাঁদের বীভৎস, মিথ্যা বা রাজনৈতিকভাবে চরমপন্থী কনটেন্ট দেখাতে পারে।
মেশিন লার্নিং টুলের অস্বচ্ছতা নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা। কিন্তু হারারি একে জাদুকরের রেশমি কাপড়ের মতো ব্যবহার করেছেন। এর আড়ালে তিনি বিষয়টিকে রহস্যময়তা থেকে পৌরাণিকীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তবে এই কৌশলেও তিনি পিছিয়ে পড়েছেন কিসিঞ্জার, মুন্ডি ও শ্মিটের তুলনায়। তাঁদের জেনেসিস বইকে বলা চলে দ্য এজ অব এআই-এর উত্তরাধিকার। নারায়ণন ও কাপুরের ভাষায়, সেটি ছিল অতিরঞ্জনে নিরবচ্ছিন্ন এবং এআই প্রচারণায় ভরপুর।
জেনেসিস-এর ভেতরের দাবিগুলো বিচার করাই কঠিন। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাঁদের ধারণা এতটাই দূরের যে স্বয়ং লেখক সেটিকে গুরুতর প্রযুক্তিগত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নিতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আসলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইন্টারস্টেলার ফ্লিটস বা আন্তনাক্ষত্রিক বহর শব্দটি এমন কোনো বইয়ে স্থান পাওয়াই উচিত নয়, যদি সেটি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিরিয়াস কোনো দাবি করতে চায়!’
গদ্যের বাহার থাকলেও জেনেসিস মূলত আড়ম্বরপূর্ণ ঐতিহাসিক অভিযাত্রার একটি ক্রম। সেখানে মানব প্রচেষ্টা এআইয়ের হাতে এসে রূপান্তরের এক অচেনা সীমানায় দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু এআই কি হবে বিজেতা? মানব নেতা কি হবে তাদের প্রতিনিধি; সার্বভৌমত্বহীন এক সার্বভৌম? ‘নাকি দেবসদৃশ এআই আবার ফিরিয়ে আনবে এককালের ঈশ্বরপ্রদত্ত রাজশক্তির ধারণা, যেখানে রাজাদের অভিষেক করবে এআই নিজেরাই?
কিসিঞ্জার, মুন্ডি ও শ্মিটের লেখা বই জেনেসিসঅথবা মানুষের মস্তিষ্কভিত্তিক কাঠামোযুক্ত যন্ত্রের আপাত শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা ও আমাদের তাদের ওপর প্রবল নির্ভরতা মিলিয়ে কি মানুষকে এই বিশ্বাসে পৌঁছে দেবে যে আমরা নিজেরাই দেবত্বে মিশে যাচ্ছি, কিংবা দেবতায় রূপান্তরিত হচ্ছি?
সিলিকন ভ্যালির তথাকথিত বৌদ্ধিক সংস্কৃতির সাধারণ আবর্জনা ভেবে এসব তুচ্ছ করাই যথেষ্ট মনে হতে পারে, যতক্ষণ না এর ভেতরে গভীর রাজনৈতিক অনুরণন ধরা পড়ে। কিসিঞ্জার, মুন্ডি ও শ্মিট প্রায়ই ভাবেন ফেটালিজম, প্যাসিভিটি, সাবমিশন ও ফেইথ নিয়ে; তাঁরা ভাবেন, স্বতন্ত্র মানুষ ও সমগ্র মানবসমাজ শক্তিশালী এআইয়ের আগমনে সাড়া দিতে পারে। হারারির মতো তাঁরাও এআইয়ের অস্বচ্ছতার প্রসঙ্গ টেনে এনে এমন প্রশ্নকে বৈধতা দেন। এআইয়ের যুগ কি মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অজানা কর্তৃত্বের প্রাক-আধুনিক স্বীকৃতিতে?
এআই দিয়ে লেখা চেনার উপায় কীগদ্যের বাহার থাকলেও জেনেসিস মূলত আড়ম্বরপূর্ণ ঐতিহাসিক অভিযাত্রার একটি ক্রম। সেখানে মানব প্রচেষ্টা এআইয়ের হাতে এসে রূপান্তরের এক অচেনা সীমানায় দাঁড়িয়ে যায়।
এই ধরনের প্রশ্ন পাঠকের মনে পাল্টা প্রশ্নও জাগায়। যে প্যাসিভিটি বা নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁরা এত ব্যস্ত, সেটি কি পাঠকের মনে একই মনোভাব রোপণ করারই একটি সূক্ষ্ম কৌশল? ধনকুবের ও করপোরেট মালিকদের কি এমন কোনো লাভ আছে, যা সাধারণ মানুষকে ফেটালিজম বা নিয়তিবাদকে সম্মানজনক ও যুক্তিসংগত ভাবতে শেখানোর মাধ্যমে অর্জিত হয়? এআইকে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং অজ্ঞেয় হিসেবে চিত্রিত করা কি মিডিয়াকে মোহিত করার, সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রকদের ভড়কে দেওয়ার এবং সর্বোপরি আর্থিক বাজারকে উত্তেজিত করারই কোনো সুচতুর কৌশল নয়?
জেনেসিস বইটি বিপ্লব ও বিপর্যয়, শুরু ও সমাপ্তির আবেশে একপ্রকার এস্ক্যাটোলজি হাজির করে; যেখানে মূল ফোকাস হলো মিসঅ্যালাইন্ড এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি। লেখকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তুলনা করেছেন পারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে ফ্রেমবন্দী করেছেন ঠান্ডা যুদ্ধের পুনরাবৃত্ত আর্মস রেস প্রতিযোগিতা হিসেবে।
কিসিঞ্জার ধাঁচের এই ভবিষ্যৎচিন্তা পরের যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মতোই শোনায়। কিন্তু বাস্তব, দীর্ঘস্থায়ী পারমাণবিক সর্বনাশের সম্ভাবনার সঙ্গে অস্পষ্ট, অনুমাননির্ভর এআইয়ের বৈশ্বিক ঝুঁকিকে সমান পাল্লায় মাপা কোনো বিশেষ ব্যতিক্রম নয়। ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান নিজেও এ কৌশলকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরেছেন। তিনি জেনেসিস-কে উচ্চ প্রশংসা করেছেন এবং প্রায়ই শ্রোতাদের বলে আনন্দ পান যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে সম্ভাব্যভাবে পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটাবে।
নারায়ণন ও কাপুরের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথাকথিত অস্তিত্বগত ঝুঁকি একধরনের আতঙ্কের ভূত; যা প্রযুক্তিটির সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেখায়, এর সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকদের মনোযোগ সরিয়ে দেয় এআই স্নেক অয়েলের বাস্তব ও তাৎক্ষণিক ক্ষতির দিক থেকে।
আমার নিজের মতে, এই আতঙ্ক আমাদের কল্পনাকেও একচেটিয়াভাবে দখল করে ফেলে এবং আলোচনাকে এক উন্মত্ত মাত্রায় নিয়ে যায়; যা বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে এবং বড় বড় কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো কব্জা করার পথ আরও সুগম করে দেয়।
২০২৩ সালে স্যাম অল্টম্যান সিনেট কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এআইয়ের বিপদ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন এবং একটি সরকারি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। সেটা সুবিধাজনকভাবে ওপেনএআইয়ের প্রথম-সারির সুবিধাকে চিরস্থায়ী করে দিত। কারণ, এতে নতুন প্রতিযোগীদের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিশাল বোঝা চাপানো যেত। অথচ ওপেনএআইয়ের ওপর গবেষকেরা যে স্বচ্ছতার নিয়ম চালু করতে বলছিলেন, তা সহজেই এড়িয়ে যাওয়া হতো।
একবার সার্চ করলে এআই চ্যাটবটের বিদ্যুৎ খরচ কতনারায়ণন ও কাপুরের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথাকথিত অস্তিত্বগত ঝুঁকি একধরনের আতঙ্কের ভূত; যা প্রযুক্তিটির সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেখায়, এর সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে।
এআই যদি অবিবেচনাপ্রসূতভাবে সামাজিক কাঠামোর ভেতর যুক্ত করা হয়, তবে তা অবশ্যই হুমকি তৈরি করবে। তবে নারায়ণন ও কাপুরের যুক্তি হলো, সমাজের কাছে ইতিমধ্যেই সেই ঝুঁকিগুলো শান্তভাবে মোকাবিলার সরঞ্জাম রয়েছে। অন্যদিকে অল্টম্যান, জেনেসিস-এর লেখকেরা এবং তথাকথিত এআই সেফটি কমিউনিটির তৈরি করা বিদ্রোহী এআইয়ের যে ভীতিকর চিত্র, তা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতেই সীমাবদ্ধ রাখা শ্রেয়।
রে কার্জওয়েলের কাজই হলো বিজ্ঞান কল্পকাহিনি থেকে ধার করা ধারণা আমদানি করা। তাঁর বই দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ার-এর নামধারী ঘটনাটি প্রথম জনপ্রিয় করেছিলেন সাই-ফাই কিংবদন্তি ভার্নর ভিঞ্জ। তিনি ১৯৯৩ সালের এক প্রবন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, মোটামুটি ৩০ বছরের মধ্যে অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব ঘটবে এবং মানব যুগের সমাপ্তি হবে।
কার্জওয়েলের আরেক বই দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ারার-এর ভিত্তি হলো, মানবতা এখন এই বিলম্বিত প্রযুক্তিগত র্যাপচারের শেষ প্রস্তুতি শুরু করেছে; এটি এমন এক ঘটনা। সেটা তিনি তাঁর ল অব অ্যাকসিলারেটিং রিটার্নসের মাধ্যমে নিশ্চিত বলে দাবি করেন। এই আইনে বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ এবং ব্যয়ের পতন পরবর্তী ধাপের নকশা করাকে আরও সহজ করে তোলে।
রে কার্জওয়েলের লেখা বই দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ারকার্জওয়েলের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নানা ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করে এমন দ্রুত ও ধারাবাহিক অগ্রগতি ঘটাবে যে ২০৪৫ সালের দিকে মানুষ এআইয়ের সঙ্গে মিশে যাবে। এটিই তাঁর সেই সিঙ্গুলারিটি; এক কাল্পনিক ঘটনা। এটা তাঁর চিন্তার প্রাথমিক কৌশল প্রকাশ করে, যেখানে প্রায় সবটাই কেবল সরল প্রক্ষেপণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
কার্জওয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীর ধরন সাধারণত একটি নির্দিষ্ট শিল্পক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতির উদাহরণ দিয়ে শুরু হয়। যেমন চিকিৎসা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০২৩ সালে মেশিন লার্নিংভিত্তিক একটি ওষুধ বিরল এক ফুসফুসের রোগের চিকিৎসার জন্য ফেজ-টু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রবেশ করেছে। এরপর তিনি ঢুকে পড়েন দর্শন বা গণিতের এক গোলকধাঁধায়।
এআই কি বেকারত্ব বাড়াবেকার্জওয়েলের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নানা ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করে এমন দ্রুত ও ধারাবাহিক অগ্রগতি ঘটাবে যে ২০৪৫ সালের দিকে মানুষ এআইয়ের সঙ্গে মিশে যাবে।
তিনি পাঠককে বিভ্রান্ত করেন অস্পষ্ট জারগন ও বড় বড় সংখ্যা দিয়ে। যেমন প্রতি সেকেন্ডে ১০২৪টি অপারেশন, ৩০৬০০০০০ গিগাবাইট, ১০০ ট্রিলিয়ন মানুষ, এক গুগলপ্লেক্স শূন্য, মিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন সম্ভাবনা। এগুলোই যেন প্রমাণ করছে যে তথাকথিত এক্সপোনেনশিয়াল অগ্রগতি সব প্রতিবন্ধকতা, সীমা ও বটলনেক ভেদ করে এগিয়ে যাবে, অন্তত তিনি যেগুলোর উল্লেখ করেন।
এই প্রদর্শনের ভেতরটা যেন এক ফাঁদে আটকানো পাখির ছটফটানি। কারণ, প্রমাণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়ের সীমা থেকে বেরিয়েই কার্জওয়েল সত্যিকার অর্থে উড়তে শুরু করেন। তাঁর দাবি, এআই চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটালে ২০৩০-এর দশক থেকেই এআই-নিয়ন্ত্রিত ন্যানোরোবট দিয়ে মানুষের আয়ুর জৈবিক সীমাবদ্ধতার মোকাবিলা সম্ভব হবে এবং শেষমেশ বার্ধক্যের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটবে! আর ২০৪০-এর দশকে ক্লাউড-ভিত্তিক প্রযুক্তি মানুষকে পুরোপুরি জৈব দেহ ত্যাগ করে মস্তিষ্ককে ডিজিটাল পরিবেশে আপলোড করার সুযোগ দেবে।
কার্জওয়েল কেন এত নির্দিষ্ট সময়সীমায় নিজেকে আবদ্ধ করেন, যে জন্য তাঁকে আগেও বারবার সংশোধন করতে হয়েছে; এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। কোনো ভবিষ্যদ্বক্তার তো অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট থাকাই সুবিধাজনক। কিন্তু তখনই মনে পড়ে যায়, কার্জওয়েলের বয়স এখন সাতাত্তর বছর। আর হয়তো তিনি পরবর্তী তিন দশককে বেছে নিয়েছেন মানব-অতিক্রমণের জানালা হিসেবে। কারণ এই সময়সীমাতেই তাঁর নিজের ভবিষ্যদ্বাণী নিজ চোখে পূর্ণ হতে দেখার সম্ভাবনা রয়েছে!
ব্যর্থতার নিরাপত্তা হিসেবে তিনি অর্থ দিয়ে নিজের শরীরকে ক্রায়োজেনিকভাবে হিমায়িত ও সংরক্ষণ করিয়ে রেখেছেন, যেন পুনরুত্থিত হয়ে নিজের দূরদৃষ্টি দেখে নিজেই বিস্মিত হতে পারেন! কার্জওয়েলের কাছে মৃত্যু হলো নিছক এক প্রযুক্তিগত সমস্যা। যেকোনোভাবে যত বিকৃত সমাধানেই হোক না কেন, একে মোকাবিলা করতেই হবে।
পাঠকের চোয়াল হা হয়ে যায় যখন তিনি বর্ণনা করেন ড্যাড বটের কথা। একে তিনি পারিবারিক নথির ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষিত করেছিলেন ‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে আনার প্রথম ধাপ’ হিসেবে। পরে তাঁর সেই অনুকরণ তৈরি ‘বাবা’র সঙ্গে কথোপকথনটি করুণ হয়ে ওঠে। তবে যেসব কারণে কার্জওয়েল ভেবেছিলেন, সেসব কারণে নয়।
এআই কি বদলে দেবে গণিতের সৌন্দর্যকার্জওয়েলের কাছে মৃত্যু হলো নিছক এক প্রযুক্তিগত সমস্যা। যেকোনোভাবে যত বিকৃত সমাধানেই হোক না কেন, একে মোকাবিলা করতেই হবে।
প্রযুক্তির মূল প্রতিশ্রুতি হলো, ক্লান্তিকর শ্রম হ্রাস। তাহলে এটি কেন যথেষ্ট বলে মনে হয় না? কারণ অন্তত এআইয়ের ক্ষেত্রে হয়তো এখনো স্পষ্ট নয় যে কোন শ্রম বাস্তবিক অর্থে কমাতে সক্ষম। আমি নিজে নারায়ণন ও কাপুরের মতোই বিশ্বাস করি, মেশিন লার্নিং নানা শিল্পক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রয়োগ খুঁজে নেবে আর এর অন্তর্নিহিত কম্পিউটার বিজ্ঞানও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলবে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিশ্রুতি আমাদের এটা বিশ্বাস করানোর মতো যথেষ্ট নয় যে আমরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বছরগুলোতে বসবাস করছি; যেমনটি কার্জওয়েল দাবি করেন।
আমার মনে প্রশ্ন জাগল, সিলিকন ভ্যালির বহু নেতা, গবেষক ও সাংবাদিকের উদ্যোগে চালানো এক অসংগঠিত অথচ বৈশ্বিক ধোঁয়াশা ও প্রভাবিতকরণ অভিযানের কথা ভাবলে হাইপ শব্দটি কি যথেষ্ট? জনগণ এই অভিযানের কাছে অসহায়, আংশিকভাবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঞ্চিত প্রকৃতির কারণে। যেমন, চ্যাটজিপিটি বোঝার জন্যই দরকার এর ভিত্তি হয়ে থাকা টুল ও বিষয়গুলোর প্রাথমিক ধারণা; যেগুলো আবার নির্ভর করে আরও আগের কিছু ধারণার ওপর।
ফলে এ ধরনের প্রযুক্তি এক সঞ্চিত মানসিক ব্যয় আরোপ করে। প্রতিটি প্রযুক্তির জন্য ভিন্ন এক সংকটসীমায় এসে সেই বোঝা এতই ভারী হয় যে সাধারণ মানুষ আর সময় বা শক্তি খুঁজে পায় না প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার; যা আসলে হাইপের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র। কিন্তু এর নিশ্চিত লক্ষণ মোটেও উদাসীনতা নয়; বরং ওপরিতলীয় মুগ্ধতা ও বিস্মিত চোখে ইউটোপিয়ান কল্পনা।
তাহলে, হাইপ আসলে এক সামাজিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে প্রযুক্তি একপ্রকার জাদুতে রূপ নেয়। জেনেসিস-এর লেখকেরা যখন আর্থার সি. ক্লার্ককে উদ্ধৃত করেন—যেকোনো পর্যাপ্ত উন্নত প্রযুক্তি জাদু থেকে অবিচ্ছেদ্য—তখন তাঁরা এটি উল্লেখ করেন না যে ক্লার্ক এখানে বোঝাচ্ছিলেন ঊনবিংশ শতকের বিজ্ঞানীর চোখে বিংশ শতকের প্রযুক্তিকে। তাঁদের কাছে ক্লার্কের সেই উক্তি আসলে একটি স্লোগানমাত্র, যার মূল লক্ষ্য একটাই: নতুন খেলনা ও সরঞ্জাম নিয়ে আমাদের শিশুসুলভ মোহ কৃত্রিমভাবে দীর্ঘায়িত করা, যাতে প্রযুক্তিবিদেরা তাঁদের অদ্ভুত প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করার জন্য আরও কিছুটা সময় কিনে নিতে পারেন।
জিহ্বা দেখেই রোগ বলে দেবে এআইকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিশ্রুতি আমাদের এটা বিশ্বাস করানোর মতো যথেষ্ট নয় যে আমরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বছরগুলোতে বসবাস করছি; যেমনটি কার্জওয়েল দাবি করেন।
কোনো প্রযুক্তির কার্যকারিতা স্পষ্ট করার আগেই সেটি বানানো বা মানিয়ে নেওয়া সাধারণত ব্যর্থ পণ্যেরই লক্ষণ। কিন্তু গত তিন দশকে বহু শীর্ষ প্রযুক্তি স্টার্টআপ, করপোরেশন ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম এক উল্টো যুক্তিতে পরিচালিত হয়েছে; যা মেশিন লার্নিংয়ের ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনকভাবে সফল প্রমাণিত হয়েছে।
এই সাফল্যের আংশিক কারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কিছু মানুষ, যেমন স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিরা; যাঁরা উচ্ছ্বাস তৈরি করার শিল্পকে পরিপূর্ণ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে এআইকে ঘিরে তৈরি হওয়া হাইপ নিছক নির্দোষ প্রচারণার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। কী কী সম্ভব; এমন প্রত্যাশা তৈরি করে কার্জওয়েল, হারারি ও তাঁদের অনুরূপরা আসলে পথ প্রশস্ত করছেন টেক সিইওদের তুলনামূলক বিনয়ী প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাপক জনগ্রহণযোগ্যতার জন্য।
কিন্তু এগুলো সবই একধরনের কার্টুন, যা শক্তিশালী হলেও সীমাবদ্ধ প্রযুক্তির বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এআই নিয়ে যদি একটি নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়, তবে সেটি হলো—যে ক্ষেত্রেই এটি সফল প্রয়োগ পাবে, তা জনসচেতনতায় অবিরামভাবে ঠুকে দেওয়া হবে।
কিন্তু হিসাব রাখা হবে না সেই সুযোগ ব্যয়ের, যা আসে এমন এক শিল্প থেকে যেখানে সবকিছু বা কিছুই নয় এমন মনোভাব কাজ করে এবং যেখানে মেশিন লার্নিং আসলে যে নিরস সমস্যা ও দৈনন্দিন অদক্ষতা দূর করতে পারত, তা অবহেলিতই থেকে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন সামান্য হলেও উন্নত করার প্রকল্পকে শেষমেশ বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে এক অসম্ভব ইউটোপিয়ার সেবায় অচিন্তনীয় অপচয়ের বিনিময়ে।
লেখক: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, এ. আই. বিহেভিয়োরাল রিসার্চারসূত্র: ইউভাল নোয়া হারারি, নেক্সাস: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব ইনফরমেশন নেটওয়ার্কস ফ্রম দ্য স্টোন এজ টু এআই; রে কার্জওয়েল, দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ারার: হোয়েন উই মার্জ উইথ এআই; হেনরি এ. কিসিঞ্জার, ক্রেইগ মুন্ডি ও এরিক শ্মিট, জেনেসিস: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, হোপ, অ্যান্ড দ্য হিউম্যান স্পিরিট; অরবিন্দ নারায়ণন ও সায়াশ কাপুর, এআই স্নেক অয়েল: হোয়াট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ক্যান ডু, হোয়াট ইট কান্ট, অ্যান্ড হাউ টু টেল দ্য ডিফারেন্সএআই কি কখনো মানুষের চেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে পারবে