পদ্মায় বাসডুবি নিয়ে ফেসবুকে এআই ভিডিওর ছড়াছড়ি
· Prothom Alo

‘দেশবাসী, দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে একটি বাস পড়ে গেছে…সবাই ভিডিওটি শেয়ার করুন…আপনাদের একটি শেয়ারে অনেক পরিবার তাদের স্বজনকে খুঁজে পাবে’— কণ্ঠে জরুরি আবেদন, পেছনে উদ্ধার তৎপরতার দৃশ্য, সামনে এক নারী ‘সেনাসদস্য’। এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি বাস নদীতে ডুবে যাওয়ার পর।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষ ভিডিওটি দেখে ফেলেন, শেয়ারও করেন হাজারো মানুষ। মন্তব্যের ঘরে অনেকে লেখেন এটিকে বাস্তব ঘটনার ভিডিও ধরে নিয়ে। ভিডিওটি আজ শনিবার নাগাদ ১৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে; ৪৬ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই ভিডিও নিয়ে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
লিংক: এখানে
তবে ভিডিওটি বিশ্লেষণে একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে। ভিডিওতে কথা বলা নারী সেনাসদস্যের নামফলক অস্পষ্ট। তাঁর বক্তব্যে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও এই ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভিডিওটির দৃশ্যপটের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রকৃত দুর্ঘটনার ছবি বা ভিডিওর কোনো সাদৃশ্য নেই। ভালো করে যাচাই করলে দেখা যায়, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতিদয়া ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার জন্য পন্টুনে অপেক্ষায় ছিল। ফেরি পন্টুনে ভেড়ার সময় ধাক্কা লাগার পর বাসটি নদীতে পড়ে যায়। বাসটির ২৬ যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
লিংক: এখানে
এই দুর্ঘটনা যখন গোটা দেশেই উদ্বেগ তৈরি করে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যার অনেকগুলো দুর্ঘটনার বাস্তব দৃশ্য দাবি করে প্রচার করা হয়, এগুলো অল্প সময়ে লাখ লাখ বার দেখাও হয়। অথচ এগুলো এআই দিয়ে তৈরি।
‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড 5.0’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ২৬ মার্চ ‘দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এই বাসটি পানিতে পড়ে যায়’ ক্যাপশনে ১৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে। ভিডিওটি ২০ লাখের বেশি বার দেখা হয় এবং প্রায় ২৩ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে। ১৬৮টি মন্তব্যের পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার শেয়ার হয়।
লিংক: এখানে
কিন্তু ভিডিওটি যাচাই করে দেখা যায়, এটি প্রকৃত দুর্ঘটনার সঙ্গে মেলে না। বাসটির রং, আশপাশের পরিবেশ ও মানুষের উপস্থিতি—কোনোটিই বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদ্ধার কার্যক্রমের দাবিতে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটির সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার কোনো মিল নেই।
ভিডিওটিতে বাস নদীতে পড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে উদ্ধারের বিভিন্ন ধাপে একাধিক অসংগতি দেখা যায়। এআই–নির্ভর ভিডিও শনাক্তকরণ টুলে বিশ্লেষণ করলে এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা পাওয়া যায়।
একই পেজ থেকে পদ্মায় বাসডুবি নিয়ে ১৬ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এতে ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘ফেরিঘাটের পদ্মা নদী থেকে বাসটি উঠানো হচ্ছে।’ আজ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৩৩ লাখের বেশি বার দেখা হয় এবং প্রায় ১৯ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে।
লিংক: এখানে
ভিডিওটিতে দিনের বেলায় ক্রেন দিয়ে বাস তোলার দৃশ্য দেখানো হলেও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ রাত সোয়া ১১টার দিকে বাসটির একটি অংশ দৃশ্যমান করে এবং সাড়ে ১১টার দিকে পুরো বাসটি পানির ওপর তোলে।
লিংক: এখানে
এ ভিডিওটিতেও বাস্তব দৌলতদিয়া ঘাটের সঙ্গে দৃশ্যগত কোনো মিল পাওয়া যায় না। ঘাটের অবকাঠামো, মানুষের চলাচল ও উদ্ধার কার্যক্রম—সবকিছুতেই অসামঞ্জস্য রয়েছে। এআই শনাক্তকরণ টুলে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি সম্পূর্ণ এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।
‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড 5.0’ পেজটি পদ্মা নদীতে বাসডুবি নিয়ে ছবি ও ভিডিওসহ মোট ছয়টি পোস্ট করে, যেগুলোর সম্মিলিত ভিউ ৬৭ লাখের বেশি। তবে এসব কনটেন্টে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি।
পেজটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার। ক্যাটাগরিতে ‘রিল ক্রিয়েটর’ উল্লেখ রয়েছে। বায়োতে লেখা—‘নামাজ বাদ দিওনা বন্ধু, এপারের জীবনের চেয়ে ওপারের জীবন অনেক সুন্দর। গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এই পেজে প্রকাশিত ভিডিওগুলো সম্পূর্ণভাবে সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। সম্পূর্ণ ভিডিও ‘AI’ দ্বারা তৈরি করা। কেউ বাস্তব মনে করবেন না। ধন্যবাদ।’
তবে এই সতর্কবার্তাটি প্রতিটি ভিডিওর উপস্থাপনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ে যাওয়া নিয়ে এমন আরও সব ভিডিও–ও দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে, তার অনেকগুলোই এআই দিয়ে তৈরি, অথচ ভিডিওগুলোতে তার কোনো ঘোষণা দেওয়া নেই।
লিংক: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে
আরও দুর্ঘটনারও এআই ভিডিও
‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড 5.0’ পেজে আরেকটি ভিডিওতে ‘চট্টগ্রাম-রাঙামাটির পথে শ্রীমঙ্গলে এই বাসটি উল্টে যায়’ ক্যাপশনে দুজন উপস্থাপক ঘটনাটি বর্ণনা করে ভিডিওটি শেয়ার করার আহ্বান জানান। ভিডিওটি ১০ লাখ বার দেখা হয়েছে, ৩০ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়েছে এবং প্রায় ৯ হাজার শেয়ার হয়েছে। এই ভিডিওটি যাচাই করে দেখা যায়, এটিও এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও।
লিংক: এখানে
২৬ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়।
লিংক: এখানে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ মার্চ রাঙামাটিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে যায়। এতে এক শিশুসহ অন্তত ১৯ জন আহত হন। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কাউখালী উপজেলার সাপছড়ি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে বাসটি উদ্ধার করে বেতবুনিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়।
১৮ মার্চ ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের নিয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নীলফামারীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় লাইনচ্যুত হয়। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যা ওই দুর্ঘটনার দৃশ্য বলে দাবি করা হয়।
লিংক: এখানে
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনাটি সত্য হলেও প্রচারিত ছবিটি সেই ঘটনার নয়। এটি এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি এবং সেটিকে বাস্তব দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
প্রথম আলোতে ১৮ মার্চ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বগুড়ার ওই ট্রেন দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, নীলফামারীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং শান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে সেই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ভাইরাল দাবির ছবিটির কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
লিংক: এখানে
সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাস্তব দুর্ঘটনা ঘটলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অনেক ছবি ও ভিডিও সেই ঘটনার নয়। বরং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কনটেন্ট তৈরি করে সেগুলোকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
লিংক: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে