জাতীয় সংসদ নির্বাচন

· Prothom Alo

আজকের রাতটা আলাদা। আজ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার রাত। রাস্তায় ব্যানার, পোস্টার, আলো, মানুষের ভিড়। সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ। টিভি চ্যানেলগুলো লাইভ আপডেট দিচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা, চায়ের দোকানে জমে উঠেছে তর্কবিতর্ক। মানুষের চোখে একধরনের অদ্ভুত প্রত্যাশা।

Visit aportal.club for more information.

সরকারি কর্মকর্তা মায়ের উৎসাহে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি সাফল্যের সঙ্গে শেষ করেছে আরমান। কিছুদিন প্রফেশনাল কাজ করে তার মনে হয়েছে, মানুষের জন্য সত্যিকারের কিছু করতে হলে সাংবাদিকতার পথেই নিজের স্বপ্ন আর দায়িত্বকে সবচেয়ে গভীরভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। আর সেই উপলব্ধি থেকে আরমান জার্নালিজমে মাস্টার্স ডিগ্রি করেছে গত বছর।

আরমান রাজনীতিতে খুব একটা জড়ায় না। কিন্তু নির্বাচন তাকে সব সময়ই আকর্ষণ করে। কারণ সে মনে করে, নির্বাচন শুধু রাজনীতি আর সংখ্যা নয়, বরং মানুষের আশা, মানুষের ভবিষ্যৎ। আরমানের বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি সব সময় বলেন, রাজনীতি মানে মানুষের সেবা করা।

আরমান এখন তরুণ সাংবাদিক। বড় কোনো চ্যানেলের রিপোর্টার নয়, ছোট অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য কাজ করে। কিন্তু তার স্বপ্ন বড়। সে চায় মানুষের গল্প বলতে, মানুষের অনুভূতি তুলে ধরতে, মানুষের কণ্ঠ শোনাতে।

আজ এক ব্যস্ত চায়ের দোকানে আরমান। দোকানভর্তি মানুষ। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ আবার চরম উত্তেজনায়। পকেটে ছোট নোটবুক, হাতে ক্যামেরা-মাইক্রোফোন আর চোখেমুখে দীপ্ত আন্তরিকতা নিয়ে আরমানের দায়িত্ব নির্বাচনের রাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করা। বড় টিভির স্ক্রিনে ফলাফল আসছে ধীরে ধীরে। দোকানের মালিক রেডিওটাও চালিয়ে রেখেছে, যদি টিভির আগে কিছু সংবাদ জানা যায়! টিভিতে দেখানো হচ্ছে বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল। গ্রাফ উঠছে, নাম পড়ছে, সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন অঞ্চলের ভোটের অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে দেখানো হচ্ছে জটিল গ্রাফের মাধ্যমে।

চারদিকে গুঞ্জন—

দাঁড়িয়ে থাকা এক কলেজছাত্র উত্তেজনায় বলল, ‘ওই গ্রাফটা দেখেন, ওইটা দেখেন!’

তারুণ্যের উদ্দীপ্ততায় ভরপুর ইউনিভার্সিটির এক ছাত্র বললেন, এইবার কিন্তু বদলে যাবে সব!

তার পাশেই এক সাহসী মধ্যবয়সী লোক হেসে বললেন, ‘বদলাবে? আরে ভাই, বদলায় নাকি কিছু? দেখা যাক!’

দোকানের চা-ওয়ালা কিশোর ট্রে হাতে নিয়ে এসে বলল, ‘স্যার, চা নেবেন? আজকের চা ভোটের মতো গরম!’

গম্ভীর চেহারার স্কুলশিক্ষক চশমা ঠিক করতে করতে বলেন, তথ্য বেশি হলে মানুষ বেশি বিভ্রান্ত হয়, এটাই স্বাভাবিক।

আত্মবিশ্বাসী একজন রাজনৈতিক কর্মী শ্রুতিমধুর জোরালো কণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের দল এগিয়ে আছে, আমরা নিশ্চয়ই সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে!’

এশার নামাজের পর স্থানীয় মসজিদের ইমাম সাহেব হেঁটে যাওয়ার পথে একটু থেমে বললেন, ‘আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ মতামত অন্যদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পেশ করি।’

মানুষের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের পেশাগত দায়িত্বে ব্যস্ত আরমান। তবু ভিড়ের ভেতর কেন যেন নিজেকে একা মনে হয় তার। মনটা বারবার ছুটে যায় অন্য কোথাও। একটু অন্যমনস্ক হয়ে আরমানের স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে গত বছরে জার্নালিজমে মাস্টার্স কোর্সের গবেষণালব্ধ কাজের থিসিস। নন্দিত, প্রশংসিত ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা’ শিরোনামের থিসিসের উপসংহারে আরমান লিখেছে, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশবাসীর জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। মানুষের চোখে ভেসে ওঠে নতুন সম্ভাবনার আলো। নির্বাচিত সরকার উন্নয়নকে সামনে রেখে জনগণকে পথ দেখাবে, জনসেবাকে করবে আরও মানবিক আর প্রতিদিনের জটিল সমস্যাগুলোর দেবে বাস্তবসম্মত সমাধান। নাগরিকেরা চান অর্থনীতির চাকা ঘুরবে আরও দ্রুত, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা আর সবার জন্য সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি। আমাদের যেন আর শুনতে না হয় তরুণদের সেই দীর্ঘশ্বাস। আমরা চাই কাজের সুযোগ, চাই স্বপ্ন দেখার সাহস। মায়েদের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রার্থনা, আমার সন্তানের ভবিষ্যৎটা শুধু নিরাপদ হোক।

‘বয়োজ্যেষ্ঠদের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা সেই বেদনামাখা সত্য, গণতন্ত্র শুধু ভোটে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের সম্মান নিশ্চিত করাও জরুরি।

‘এসব জনপ্রত্যাশা যেন এক বিশাল সম্মিলিত নিশ্বাস। একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষায় ভর করে থাকা মানুষের হৃৎস্পন্দন।’

হঠাৎ এক বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলে ওঠেন, ‘এসব গ্রাফ-ট্রাফ বুঝি না, কে জিতেছে, সেটা বললেই হলো।’

আরমানের চোখে পড়ে, এক বৃদ্ধা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করছেন, ‘বাবা, আমাদের এলাকার ফলাফলটা কি জানিস? কেউ ঠিকমতো বলতে পারল না, একেকজন একেক কথা বলে।’

ঠিক তখনই দোকানের বাইরে হইচই শুরু। চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, মানুষের ভিড় ছুটে যাচ্ছে রাস্তার দিকে।

আরমান দ্রুত বেরিয়ে দেখে, মাঝবয়সী এক মহিলা ফুটপাতে বসে কাঁদছেন।

একজন পথচারী বলেন, ওনার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আরমান দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, কী হয়েছে?’

মহিলা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘বাবা, আমার ছেলে ভোট দিতে গেছিল সকালে। এখনো ফেরে নাই, ফোনও বন্ধ। কেউ কিছু বলতে পারছে না।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অটোচালক বলেন, ‘এই এলাকায় নেট ঠিকমতো নাই, তাই হয়তো ফোন ধরছে না।’

ক্যামেরা হাতে এক তরুণী সাংবাদিক বলেন, ‘আপনার ছেলের নামটা বলবেন? আমি লাইভে বলি?’

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মহিলা কেঁদে ওঠেন, ‘না মা, লাইভে লাগবে না…শুধু আমার ছেলেকে খুঁজে দাও।’

হঠাৎ বুকের ভেতর ভারী হয়ে গলা শুকিয়ে যায় আরমানের। সে ভাবেছে, এটা শুধু তথ্যের অভাব নয়, এটা মানুষের ভয়, মানুষের অসহায়তা।

আরমান মহিলার হাত ধরে বলে, ‘মা, আমি খুঁজে দেখি। আপনি চিন্তা করবেন না।’

কিন্তু আরমানের নিজের ভেতরই এক অদ্ভুত অসহায়তা জন্ম নিয়েছে ইতিমধ্যে। সে সাংবাদিক, অথচ সে মানুষের এই মৌলিক উদ্বেগের উত্তর দিতে পারছে না।

হাতের স্মার্টফোন দেখিয়ে এক তরুণ বললেন, ‘ভাই, আমাদের এলাকার ফলাফলটা জানেন? নেটে দেখলাম এক রকম, টিভিতে আরেক রকম। কোনটা ঠিক?’

তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর বলল, ‘ফেসবুকে তো দেখা যাচ্ছে, আমরা এগিয়ে!’

এক বিদেশি পর্যটক ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞেস করেন, ‘এটা… ইলেকশন নাইট? সবাই… কুব টেনশনে?’

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমি তো চোখে দেখি না, কেউ যদি সহজ করে বলত.…’

এক রিকশাচালক হতাশ গলায় বলেন, ‘মামা, এত তথ্য, কিন্তু কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, বুঝি না।’

দোকানদার হেসে বলেন, তথ্যের যুগে, অফুরন্ত তথ্যের মাঝে মানুষ আজ দিশেহারা।

আরমান চারদিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই সব মানুষই তো দেশের আসল শক্তি। কিন্তু তারা তথ্য পাচ্ছে না সহজভাবে। নির্বাচন শুধু ফলাফল নয়, এটা মানুষের অংশগ্রহণ, মানুষের অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও মানবিক করা যায়। মানুষের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের ফাঁকে আরমান নোটবুকে লিখে নেয়, information gap… emotional gap… people want clarity, not complexity

আরমানের মাথার ভেতরে যেন ঝড় শুরু হয়েছে। মানুষ তথ্য চায়, কিন্তু সহজভাবে, সত্যভাবে, মানবিকভাবে। সে ভাবছে, যদি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম থাকত, যেখানে ফলাফল সহজ ভাষায়, সহজ চিহ্নে, সবার জন্য বোঝার মতো করে দেখানো হতো!

রাত বাড়ছে। কেউ আনন্দে নাচছে, কেউ হতাশ হয়ে মাথা নিচু করে হাঁটছে। আরমান মানুষের মুখগুলো দেখে টের পায়, প্রতিটি মুখে আলাদা গল্প। ঠিক তখনই আকাশে আতশবাজি; রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। কিন্তু আরমানের চোখে সেই আলো ধরা পড়ে অন্যভাবে।

হঠাৎ আরমানের বুকের ভেতর একধরনের আলো জ্বলে ওঠে। মনের অজান্তে আরমান বলে, এটাই তো দেশের আসল চিত্র। এটাই তো মানুষের আসল চাহিদা। এটাই তো তার কাজ। আরমানের মাথায় একটা ঝলক খেলে যায়। একটি অ্যাপ, একটি প্ল্যাটফর্ম, একটি সিস্টেম, যা নির্বাচনের তথ্যকে সবার জন্য সহজ করে দেবে। যেখানে থাকবে, রং দিয়ে বোঝানো হবে কে এগিয়ে, অডিও সারাংশ থাকবে বয়স্কদের জন্য, ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার ব্যবস্থা, প্রতিটি এলাকার ফলাফল সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে, মানুষ বিভ্রান্ত হবে না, ভয় পাবে না, হারিয়ে যাবে না। আরমানের চোখ আরও বড় হয়ে ওঠে। এটা শুধু প্রযুক্তি নয়, এটা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

রাত গভীর হয়েছে। ধীরে ধীরে শান্ত হয়েছে সবাই। কিন্তু আরমানের ভেতরের আগুন আরও জ্বলে উঠেছে। বাড়িতে ফিরে ল্যাপটপ খুলে কোড লেখা শুরু করে আরমান। একটি সহজ ইন্টারফেস, একটি রঙিন মানচিত্র, একটি অডিও বাটন, একটি সতর্কতা সিস্টেম।

ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। আরমানের চোখ লাল, কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি। চারদিকে খোলামেলা বহুতল ভবনের জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে, সূর্য উঠছে, নতুন দিন শুরু হচ্ছে। মা–বাবার আদর্শে বড় হওয়া আরমানের মনে হয়, আজ থেকে সে শুধু সাংবাদিকই নয়, সে মানুষের গল্পের সেতুবন্ধন, তথ্যের আলো পৌঁছে দেওয়ার একজন পথিক।

ইতিমধ্যে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আরমানের উদ্ভাবিত ‘নির্বাচন ফলাফল’ অ্যাপ জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় ইনোভেশন ক্যাটাগরিতে প্রথম পুরস্কারসহ স্বীকৃতি পেয়েছে সরকারিভাবে। আসন্ন উপনির্বাচন ও অন্যান্য নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্র কিংবা অঞ্চলের ভোটের অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে দেখানো হবে ‘নির্বাচন ফলাফল’ অ্যাপের মাধ্যমে।

আচমকা শব্দে আরমান চোখ খুলে দেখে, অনেক দিনের পরিচিত সিডনি এয়ারপোর্টের রানওয়েতে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা এয়ারক্রাফট ল্যান্ড করে ক্রমেই গতিহীন হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে গেটের দিকে। বাইরে সোনালি সকালের রোদের ঝিলিমিলি। চার সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে সিডনিতে নিরাপদে ফিরে আসা আরমান, এয়ারক্রাফটের ভেতরে বসে ভাবছে, তাহলে এতক্ষণ যা বলেছি, দেখেছি কিংবা শুনেছি তা কি শুধুই স্বপ্ন, সত্যিই কি তা–ই?

(প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, গল্পটি নিতান্তই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে নামের, চরিত্রের কিংবা ঘটনার মিল নিছক কাকতালীয়।)

*লেখক: মাসুদ পারভেজ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source