রবার্ট ব্রুস
· Prothom Alo

আয়মান পরপর দুবার ফেল করেছে। নতুন ক্লাসে উঠতে পারছে না, মানে এইট থেকে নাইনে উঠতেই পারছে না। আশপাশ থেকে অনেকে তাকে ‘আদু ভাই’ ডাকা শুরু করেছে। আয়মানের বাসায় অবশ্য অন্য পরিস্থিতি। পাঁচ বোনের পর এক ভাই। প্রচুর প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা বলতে যা বোঝায় আরকি। ‘আহা, একটাই ভাই, করুক না ফেল, কী যায় আসে...’—এমন একটা ভাব। ওদিকে বোনেরা সব ডাক্তার–ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আয়মান যেন ক্লাস এইটেই ফিক্সড ডিপোজিট হয়ে গেছে। একদিন বড় বোনকে জিজ্ঞেস করল আয়মান, ‘আপু, আদু ভাই মানে কী?’ ‘উফ’ বলে প্রায় ডাক্তার হতে যাওয়া বড় বোন মাথা চেপে ধরে বলল,
Visit orlando-books.blog for more information.
‘কেন, তোকে সবাই এই নামে ডাকা শুরু করেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ডাকারই কথা। তুই রবার্ট ব্রুসের নাম শুনেছিস?’
‘না।’
এবার ডাক্তার বোনের পাশে বসা প্রায় ইঞ্জিনিয়ার হতে যাওয়া বোন মাথা চেপে ধরল। তারপর বলল,
‘তুই একটা কাজ কর।’
‘কী?’
‘পরীক্ষা পাসের একটা তাবিজ জোগাড় কর।’ এ সময় মা এসে উদ্ধার করেন আয়মানকে। রীতিমতো একটা হুংকার দিয়ে মা বলেন, ‘তোরা শুরু করেছিস কী...অ্যাঁ? সব সময় ওর সঙ্গে ঠাট্টা- ইয়ার্কি? আয়, আয়মান বাবা, খাবি। তোর জন্যে পুডিং করেছি।’
আহসান হাবীবের কমিকস 'পটলা-ক্যাবলা'বড় দুই বোন ফিসফাস করে, ‘মা-ই পুডিং খাইয়ে খাইয়ে ওর মাথাটাকেও একটা পুডিং বানিয়ে ফেলেছে ... ওর আর পাস করার উপায় নেই।’
কিন্তু না, আয়মান এবার সিরিয়াস। যেকোনো মূল্যে তাকে এবার পাস করতেই হবে। স্কুলের যেসব জুনিয়র আগে ‘আয়মান ভাই’ ডাকত, তারা এখন নাম ধরে ডাকা শুরু করেছে। যে করেই হোক, এবার পাস করতে হবে। বাসায় অবশ্য প্রায় প্রত্যেক বিষয়ের একজন প্রাইভেট শিক্ষক আসতে শুরু করেছেন। তাতেও কাজ হবে বলে আয়মানের মনে হচ্ছে না। তার দরকার একটা পাস করার তাবিজ। যেমনটা বড় বোনেরা বলাবলি করছিল।
সত্যিই কি পাস করার তাবিজ পাওয়া যায়?
খোঁজখবর নিয়ে সত্যি সত্যি সে একটা পাস করার তাবিজ জোগাড় করে ফেলল। এর জন্য আগের ক্লাসের ফয়সাল তাকে সাহায্য করল। ফয়সালকে অবশ্য নগদ ২০০ টাকা দিতে হয়েছে আর ডাবল ডিমের মোগলাই খাওয়াতে হয়েছে। আর তাবিজের জন্য লেগেছে আরও নগদ ৫০০ টাকা। যিনি তাবিজটা দিয়েছেন, মানে সেই সাধু বাবাজি, (সাধুই বলতে হবে তাঁকে; মাথায় লাল পাগড়ি । থুতনিতে সামান্য একটু দাড়ি। গায়ে কাপড়চোপড় খুব একটা নেই বললেই চলে) তাবিজ দিয়ে বলেছেন,
‘এই তাবিজ বাঁহাতের কবজির দুই ইঞ্চি ওপরে বাঁধতে হবে, ঠিক শনিবার মধ্যরাতে।’
‘তারপর?’
‘তারপর পরীক্ষার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে খুলে ফেলতে হবে।’
‘খুলে ফেললে পাস করব কীভাবে?’ আয়মান প্রশ্ন না করে পারে না।
‘উফ! কোনো প্রশ্ন নয়। যা বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো।’
‘আচ্ছা, বলেন।’
আহসান হাবীবের ভৌতিক গল্প 'পেত্তুনি'‘খুলে ফেলে তাবিজটা ভেঙে ফেলবে।’
‘ভেঙে ফেলব?’ আঁতকে ওঠে আয়মান।
‘আহ! কোনো কথা নয়। যা বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো...’
‘জি, বলেন।’
‘ভেঙে তার ভেতরের সাত ভাঁজ করা কাগজটা বের করবে।’
‘করলাম।’
‘তারপর ওই কাগজে যা লেখা আছে, তা মনোযোগ দিয়ে সাতবার পড়বে।’
‘তাহলেই পাস?’
এ পর্যায়ে এসে সাধু বাবা আর কোনো কথা বললেন না, ওপরের দিকে তাকিয়ে দুচোখ বন্ধ করে কী একটা বলে হুংকার দিলেন। তখনই ফয়সাল আয়মানের কাঁধে টোকা দিয়ে ইশারা করল, যার অর্থ, ‘উঠে আয়। সাধু বাবা যা বলার, বলেছেন। উনি এখন মহাসমাপ্তি ধ্যানে চলে গেছেন। তাঁকে আর এই জগতে পাওয়া যাবে না।’ তবে সাধু বাবার পায়ের কাছে ৫০০ টাকার নোটটা ভক্তিভরে রেখে আসতে হলো।
বাঁহাতে তাবিজ বাঁধার পর বেশ ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়ায় আয়মান। সবচেয়ে ছোট বোন মানে পাঁচ নম্বর বোনের নাম মা রেখেছেন পঞ্চমী। সে অবশ্য আয়মানকে নিয়ে বেশ একটু ভাবে। সে-ই বাঁহাতে পরীক্ষা পাসের তাবিজটা বেঁধে দিয়েছে। কাউকে কিছু বলা যাবে না এই শর্তেই বেঁধে দিয়েছে। একা একা তো আর হাতে তাবিজ বাঁধা যায় না।
‘এই তাবিজে কি সত্যিই পাস হবে?’ কোনোরকমে হাসি চেপে জানতে চায় কলেজপড়ুয়া বোন।
‘এক চান্সে পাস।’
‘কে দিয়েছে?’
‘এক সাধু।’
‘সেই সাধু কোথায় থাকে?’
আহসান হাবীবের কিশোর উপন্যাস 'টেম্পার অ্যাকশন ক্লাব' (প্রথম পর্ব)‘সে এখন আছে মহাসমাপ্তি ধ্যানে।’ এর বেশি কিছু আর আয়মান ফাঁস করল না। পঞ্চম বোনও আর বেশি ঘাঁটাল না। তবে ছোট ভাইটার জন্য ভেতরে ভেতরে একটু ভাবনাই হলো তার। সত্যিই এবারও যদি পাস না করে, তাহলে কী হবে? অন্য বোনদের কি জানানো উচিত যে সে হাতে পরীক্ষা পাসের তাবিজ বেঁধে দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? পড়াশোনার ধারেকাছেও নেই। প্রাইভেট টিউটররা সব এসে এসে ফিরে যাচ্ছে। দু–একজন টিউটর অবশ্য বাবার সঙ্গে বসে রাজনীতির আলাপ করে চা–নাশতা খেয়ে যাচ্ছে। বাবা এতেই খুশি। রিটায়ার্ড জীবনে আড্ডা মারার মানুষজন তো নিয়মিত বাসায় আসছে, মন্দ কী?
মহাসমাপ্তির সেই সাধুর কথামতো আয়মান পরীক্ষার দুসপ্তাহ আগে তাবিজ ভেঙে তার ভেতর থেকে সাত ভাঁজ করা পাতলা কাগজটা বের করল। তাতে সুন্দর হস্তাক্ষরে ওপরে আন্ডারলাইন করে লেখা—‘মনোযোগসহকারে নিচের রুটিন ফলো করে পড়াশোনা চালিয়ে যাও।’ নিচে সাত দিনে কখন কোন সাবজেক্ট কয় ঘণ্টা, কত মিনিট, কত সেকেন্ড পড়তে হবে, তার একটা নিখুঁত তালিকা করে দেওয়া।
তারপর দুসপ্তাহ পার হয়েছে। আয়মানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে, একসময় শেষও হয়েছে।
তারও কিছুদিন পর পাঁচ বোন আর মা–বাবাকে (প্রাইভেট টিউটরদেরও) অবাক (নাকি হতবাক) করে দিয়ে আয়মান এবার সসম্মান এইট থেকে পাস করে নাইনে উঠল। পরদিন মানে রেজাল্ট বের হওয়ার পরদিন পাঁচ বোন মিলে একটা সুন্দর কেক বানিয়ে আনল। তার ওপরে সাদা ক্রিম দিয়ে বড় বড় করে লেখা—‘আমাদের রবার্ট ব্রুস’। আয়মান আনন্দের সঙ্গেই সেই কেক কাটল। কেকটা মাড কেক। মাড কেক যে তার প্রিয়, এটা যে তার বড় বোনেরা মনে রেখেছে, এতেই সে খুশি। আর সঙ্গে রইল মায়ের পুডিং। পুডিংয়ের সাইজও প্রায় কেকের কাছাকাছি, মায়ের হাতের তৈরি পুডিংও আয়মানের কম প্রিয় নয়।
এক বইয়ে চল্লিশটি গোয়েন্দা অভিযান