কিউবার সংকট সামনে আনল কাস্ত্রোর নাতিকে
· Prothom Alo

কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গিলারমো রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে এই প্রথম দেশটির প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ ক্যানেলের সঙ্গে দুটি কর্মসূচিতে দেখা গেল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দ্বীপদেশটি যখন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সরকার পরিবর্তনের হুমকির মুখে, তখন কিউবার নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা নিয়ে কৌতূহল তৈরি করেছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
গত শুক্রবার কমিউনিস্ট পার্টি ও মন্ত্রিপরিষদের নেতাদের সঙ্গে দিয়াজ ক্যানেলের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রদ্রিগেজ কাস্ত্রো। পরে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে কিউবার চলমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, কয়েক দশক ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে খবর প্রকাশিত হয়, কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে, এমন খবর দেয় মার্কিন নিউজ পোর্টাল এক্সিওস। তবে সিএনএন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বা কিউবা সরকারের কাছে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রদ্রিগেজ কাস্ত্রো ধীরে ধীরে জনসমক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। সরকার পরিবর্তন হলে তিনি নেতৃত্বের ভূমিকাও নিতে পারেন, কারণ, কিউবা এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে আছে।
গভীর হচ্ছে কিউবার সংকট
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, জ্বালানিসংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় কিউবার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট বাড়ছে, হাসপাতালে অস্ত্রোপচার সীমিত করা হয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানির ঘাটতি তীব্র হয়েছে আর পর্যটক গেছে কমে। এককথায় দেশটি মানবিক জরুরি অবস্থার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
৪১ বছর বয়সী রদ্রিগেজ কাস্ত্রো তাঁর নানা রাউল কাস্ত্রোর নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা রাউল কাস্ত্রোর মেয়ে দেবোরা কাস্ত্রো এসপিন। বাবা লুই আলবার্তো রদ্রিগেজ লোপেজ-সেলেজা ছিলেন সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী জিএইএসএর প্রধান। রদ্রিগেজ সম্পর্কে কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোরও নাতি।
গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পর কিউবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ওই অভিযানে নিকোলা মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর সরকার দীর্ঘদিন ধরে কিউবাকে ভর্তুকি দিয়ে তেল সরবরাহ করত।
কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা ওয়াশিংটনের একটি বড় কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে পতন ঘটানো। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে দ্বীপটির অর্থনীতি আরও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, মাদুরোকে আটক করার ওই অভিযান কিউবার দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। মাদুরোকে রক্ষায় নিয়োজিত বহু কিউবান নিরাপত্তারক্ষী সেদিন নিহত হন, অথচ মার্কিন বাহিনীর কেউ হতাহত হয়নি।
দিয়ানা কোরেয়া, পরিচালক, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস প্রোগ্রাম অ্যাট তেকনোলজিকো দে মনতেরিদিয়াজ ক্যানেলের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাউল কাস্ত্রো এখনো কিউবার রাজনীতিতে প্রভাবশালী এবং নাতির ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা আছে।ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর কিছু মিত্রকে ক্ষমতায় রেখে দেওয়া—যেমন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকতে দেওয়ায় ধারণা করা যায় যে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো সম্পূর্ণ সরকার পরিবর্তনের বদলে কিউবার প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারে।
মাদুরোকে গ্রেপ্তারের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গোপনে ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এখন কিউবার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গেও একই ধরনের যোগাযোগ খুঁজছেন বলে জানা যাচ্ছে।
২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নানা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন রদ্রিগেজ কাস্ত্রোনিরাপত্তা বলয় থেকে আলোচনায়
৪১ বছর বয়সী রদ্রিগেজ কাস্ত্রো মূলত তাঁর নানা রাউল কাস্ত্রোর নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা রাউল কাস্ত্রোর মেয়ে দেবোরা কাস্ত্রো এসপিন। বাবা লুই আলবার্তো রদ্রিগেজ লোপেজ-সেলেজা ছিলেন সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী জিএইএসএর প্রধান। ২০২২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্টের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা ওয়াশিংটনের একটি বড় কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে পতন ঘটানো। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে দ্বীপটির অর্থনীতি আরও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পড়েছে।
ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কিউবান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক সেবাস্তিয়ান আর্কোস বলেন, রদ্রিগেজ লোপেজ-সেলেজাকে রাউল কাস্ত্রো অনেক বিশ্বাস করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলের দ্রুত উত্থান ঘটতে থাকে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নানা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন রদ্রিগেজ কাস্ত্রো। ধীরে ধীরে তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ওঠেন এবং পরে কিউবার নিরাপত্তাব্যবস্থার কেন্দ্রের অংশ হয়ে ওঠেন।
রয়টার্সের বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, রদ্রিগেজ তাঁর ৯৪ বছর বয়সী নানাকে বিভিন্ন সময়ে পাহারা দিচ্ছেন, যার মধ্যে প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা উচ্চপদস্থ রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও আছে।
রদ্রিগেজ কাস্ত্রো কিউবায় ‘রাউলিতো’ নামে পরিচিত। এর অর্থ ‘ছোট রাউল’। সম্পর্কে তিনি কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোরও নাতি। ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি ক্ষমতা ছাড়লে রাউল কাস্ত্রো প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৬ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যু হয়।
বলা হচ্ছে, কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে, এমন খবর দেয় মার্কিন নিউজ পোর্টাল এক্সিওস। যদিও কেউই তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ফাউস্তো প্রিতিলিন বলেন, রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত থাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস প্রোগ্রাম অ্যাট তেকনোলজিকো দে মনতেরির পরিচালক দিয়ানা কোরেয়া মনে করেন, শুক্রবার দিয়াজ ক্যানেলের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাউল কাস্ত্রো এখনো কিউবার রাজনীতিতে প্রভাবশালী এবং নাতির ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা আছে।
কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন জল্পনা
সেবাস্তিয়ান আর্কোস বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্টের আরেক আস্থাভাজন ব্যক্তি তাঁর ছেলে আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো এসপিন। ২০১৮ সালে রাউল কাস্ত্রো ক্ষমতা ছাড়ার পর অনেকেই তাঁকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখতেন।
সেবাস্তিয়ান আর্কোস আরও বলেন, তাঁরা এসব উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠকে অংশ নেন, যদিও তাঁদের কারও সরকারি পদ নেই। সরকারের ভেতরে যা ঘটে, সেসব বিষয়ে তাঁরা রাউল কাস্ত্রোর পর্যবেক্ষক। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সম্ভাব্য আলোচনায় তাঁরা রাউল কাস্ত্রোর প্রতিনিধিও হতে পারেন।
একাধিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, রুবিও ও রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর মধ্যে গোপন আলোচনা হয়েছে, যদিও কেউই তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে ক্যারিবিয়ান কমিউনিটির বৈঠকের এক ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রুবিও কিউবার সংকটের প্রসঙ্গ তোলেন।
মার্কো রুবিও বলেছিলেন, কিউবাকে পরিবর্তিত হতে হবে। পরিবর্তন দরকার। সব একসঙ্গে করতে হবে না। এক দিনেই করতে হবে না। এখানে সবাই পরিণত ও বাস্তববাদী।
রুবিও আরও বলেন, ‘তাদের বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে। যদি তারা এমন সংস্কার আনে, যা কিউবার মানুষের জন্য অর্থনৈতিক এবং পরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই তা দেখতে চাইবে।’
কোরেয়া বলেন, কিউবার চলমান সংকটের মধ্যে অনেক নাগরিক রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর বাড়তি উপস্থিতিকে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কাঠামোর মধ্যেই ঘটছে।
‘অনেকেই এখন বলছেন, এটি আসলে প্রজন্মগত ক্ষমতা হস্তান্তর, হয়তো আড়ালে, কিন্তু কার্যকর নিয়ন্ত্রণে। কাস্ত্রোকে আলোচনায় আনা মানে অন্তত বাইরে থেকে এমন বার্তা দেওয়া যে আলোচনা গুরুতর, কারণ, এই ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন’, এমনটাই বলছেন দিয়ানা কোরেয়া।