গণিত নিয়ে স্বপ্ন দেখার আহ্বান

· Prothom Alo

স্বামীর অফিস আছে। তাই ছেলে মাহিন ইসলামকে নিয়ে খুব ভোরে মানিকগঞ্জ থেকে নিজেই রওনা দেন মা অজুফা খাতুন। রাজধানীর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে এসে পৌঁছান আজ শনিবার সকাল আটটায়। স্কুল প্রাঙ্গণে বেলা ১১টার দিকে তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, ছেলে মাহিন তখন জাতীয় গণিত উৎসবের প্রতিযোগী হিসেবে পরীক্ষার হলে গণিতের জটিল সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত।

Visit sweetbonanza.qpon for more information.

গণিতের প্রতি ছেলের আগ্রহের কথা বলতে গিয়ে মা অজুফার চোখ–মুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ছেলে মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সারাক্ষণ গণিত নিয়ে বসে থাকে। অনলাইন বাছাই ও আঞ্চলিক পর্বে উত্তীর্ণ হয়ে ছেলে জাতীয় পর্যায়ে এসেছে, যা সত্যি খুব খুশির ও আনন্দের। ছেলের স্বপ্ন, একদিন গণিত নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে।

সারা দেশ থেকে গতকাল ১ হাজার ১৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে জাতীয় গণিত উৎসবে। সেন্ট যোসেফ স্কুলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় এ উৎসবের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০২৬’-এ চলতি বছর ৫১ হাজার ৫৩২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে। অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড এবং আঞ্চলিক গণিত উৎসবের পর জাতীয় গণিত উৎসবের জন্য উত্তীর্ণ হয় ১ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্য থেকে গতকাল ১ হাজার ১৪৩ জন শিক্ষার্থী জাতীয় গণিত উৎসবে অংশগ্রহণ করে। উৎসবের স্লোগান ‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’।

সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপস্থিত হতে শুরু করেন অভিভাবকেরা। প্রথমে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ আঞ্চলিক বুথ থেকে আঞ্চলিক বিজয়ী টি-শার্ট ও মেডেল, সঙ্গে ব্যাজ ও বেন্ডেনা সংগ্রহ করে। পাশাপাশি আয়োজকদের কাছে তাদের উপস্থিত নিশ্চিত করে।

ঢাকার বালুঘাট থেকে বাবার সঙ্গে এসেছে কাদির মাহমুদ। বি এ এফ শাহীন কলেজের পঞ্চম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেছে, প্রথমবার গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েই জাতীয় পর্যায়ে আসতে পেরে সে খুবই খুশি। গণিত অলিম্পিয়াডে অনেক প্রশ্ন আসে, যেগুলো অনেক অ্যাডভান্সড। সেগুলো যখন সমাধান করতে পারে, তখন তার খুব ভালো লাগে।

ভোর ৫টায় দাদা, মামা ও মায়ের সঙ্গে ময়মনসিংহ থেকে রওনা দিয়ে উৎসবে যোগ দেয় মাদিহা হাসান। ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাদিহা বলে, গণিত তার ভালো লাগে। আর পরীক্ষাও তার ভালো হয়েছে। তাই সে খুশি।

ভেতরে পরীক্ষা দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বাইরে অভিভাবকদের অপেক্ষা

পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীতে শুরু উৎসব

সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল প্রাঙ্গণে গতকাল সকাল ৯টায় শুরু হয় জাতীয় গণিত উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এ সময় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের অধ্যক্ষ ব্রাদার লিও প্যারেরা; বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ আর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহতেশামুল হক খান। পতাকা উত্তোলনের সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে সেন্ট যোসেফ স্কুলের শিক্ষার্থীরা। অতিথি ও শিক্ষার্থীদের বেলুন ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষ হয়।

উদ্বোধনের পর শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধ হয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে। পরীক্ষা শুরু হয় সকাল ১০টায়। জাতীয় গণিত উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা চারটি ক্যাটাগরিতে পরীক্ষা দেয়। প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে ২ ঘণ্টা, জুনিয়র ক্যাটাগরিতে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট এবং সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ৩ ঘণ্টা করে পরীক্ষা হয়। এ আয়োজন শেষ হয় বেলা একটায়।

আয়োজকেরা জানান, জাতীয় গণিত উৎসবের বিজয়ীদের ফলাফল গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। জাতীয় পর্বের বিজয়ী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঈদের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও জাতীয় গণিত ক্যাম্প আয়োজন করা হবে।

গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠানস্থলে প্রথমা প্রকাশন, আদর্শ, তাম্রলিপি, স্বপ্ন ’৭১, ল্যাববাংলা, তৌফিক প্রকাশন, দ্বিমিক, রকমারি ডটকম, অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স, বাংলার ম্যাথ, প্রতিভাষা প্রকাশনের স্টল ছিল। উৎসবে প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিমিটেড।

গণিত নিয়ে যেন স্বপ্ন দেখতে পারি

গণিত উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে অধ্যক্ষ ব্রাদার লিও প্যারেরা বলেন, ‘আপনারা পরীক্ষা এবং অন্য যেসব বিষয় আছে, সুন্দরভাবে অংশগ্রহণ করবেন। গণিত শিখবেন। গণিতের ভাষা জীবনের সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করবেন, যেন আমরা গণিতকে ভয় না পেয়ে, গণিতকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন এবং এমন আয়োজনে সহযোগিতা করার জন্য সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, ‘তোমরা নানা সমস্যার মধ্যেও এই গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছ। এই যে একটা নতুন সংস্কৃতি বাংলাদেশে গত সিকি শতাব্দী যাবৎ আমরা শুরু করেছি, সেটা তোমাদের অংশগ্রহণে বেগবান হচ্ছে। তোমরা জানো আমরা একটি স্বর্ণপদক পেয়েছি এবং দীর্ঘদিন কিন্তু এই স্বর্ণপদক আমরা পাচ্ছি না। তাই তোমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহতেশামুল হক খান বলেন, ‘প্রায় ৫২ হাজার প্রতিযোগীর মধ্য থেকে জিতে তোমরা কিন্তু এখানে এসেছ। আজকে সবাই যে আমরা জিতে যাব, এমন না। সবাই যে চীনে যেতে পারব, এমন না। কিন্তু এই চর্চাটা যেন অব্যাহত থাকে।’ তাঁরা গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং ভবিষ্যতেও যুক্ত থাকতে চান বলে উল্লেখ করেন এহতেশামুল হক।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘একটা কথা আমরা সব সময় বলি, আমাদের একটাই লক্ষ্য বাংলাদেশের জয় দেখতে চাই আমরা। সব ক্ষেত্রে, সব জায়গায়। আমরা আছি, আমরা ছিলাম, আমরা থাকব এই গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে।...ভালো ফল করো, প্রতিযোগিতা করো, বিজয়ী হও, সামনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।’

মতিউর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ একটি স্বর্ণপদক পেয়েছে। সাতটি রৌপ্যপদক পেয়েছে। ৪০টি ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে। ৪০টির অধিক সম্মানসূচক স্বীকৃতি পেয়েছে। এসব স্বীকৃতি অনেক বড়। আবার স্বর্ণপদক পেলে তা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর জন্য উৎসর্গ করতে চান বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামিলুর রেজা চৌধুরী একটা প্রেরণা, একটি উৎসাহ ও একজন উদ্দীপনাকারী ব্যক্তি।

জাতীয় অধ্যাপক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি ২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল প্রয়াত হন।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিন ‘ম’-কে না বলান গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান। তিনি বলেন, মাদককে না বলতে হবে। না বুঝে মুখস্থ করা যাবে না। মিথ্যা কথাও বলা যাবে না।

বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করা হয় জাতীয় গণিত উৎসব। আজ শনিবার সকাল ৯টায় রাজধানীর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে

উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাকিম খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার দেব, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ডেটা অ্যান্ড সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ানা রিয়াজ, ঢাকার সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক প্রশিক্ষক রাজিয়া বেগম, টালি খাতার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাত উল্লাহ্ খান এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ফারজানা আলম।

Read full story at source