ইরান ভেনেজুয়েলা নয়, সেখানে ট্রাম্পের ‘দেলসি মডেল’ সরকার বসানো কি এত সহজ হবে

· Prothom Alo

সিআইএ তেলসমৃদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে উসকানি দেওয়া একটি দেশের প্রধানকে প্রথমে তাঁর দেশের পাহাড়ে ঘেরা রাজধানীর কেন্দ্রে অবস্থিত কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি কম্পাউন্ডে শনাক্ত করেছিল।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

এরপর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণঘাতী ও অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ওই নেতাকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। সবশেষে ওয়াশিংটনের নির্দেশ মেনে চলবে—এমন আরও অনুগত একজন উত্তরসূরিকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সম্প্রতি এই কৌশল ব্যবহার করেছেন। এ বছর ৩ জানুয়ারি ভোর হওয়ার আগে দিয়ে মার্কিন বাহিনী কারাকাস থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়।

মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ট্রাম্পের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ক্ষমতায় বসেন।

এর মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রপন্থী এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে—যা একসময় কল্পনাতীত মনে হতো। ভেনেজুয়েলার নেতারা বহু বছর ধরে ‘ইয়াঙ্কি’ বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন।

গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে রদ্রিগেজ লেখেন, ‘তাঁর (মার্কিন) সরকার একসঙ্গে কাজ করার সদয় ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, এ জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ।’

ঘনিষ্ঠ মিত্রের (নিকোলা মাদুরো) পতনের পর এটা খুব সম্ভবত দেলসির সবচেয়ে নির্ভীকচিত্তে ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর পতনের দুই মাস পর ট্রাম্প ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার দখল’ নিতে একই মডেল আবার প্রয়োগ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানে যৌথ আগ্রাসন চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ

ট্রাম্প এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘আমাকে (তাঁর উত্তরসূরি) নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে হবে, ভেনেজুয়েলায় দেলসির বেলায় যেমনটা হয়েছিল।’

নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ভেনেজুয়েলায় যা করেছি, আমি মনে করি, সেটাই যথাযথ।’

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ট্রাম্পের কৌশল হলো, মাঠে মার্কিন সেনা পাঠানোর পরিবর্তে দূর থেকে কোনো শাসনব্যবস্থার আচরণ ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা।

যদিও লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মনে এ কৌশল নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে। তাদের সংশয়, যে কৌশল কারাকাসে কাজ করেছে, তা সাত হাজার মাইল দূরের তেহরানে কার্যকর হবে কি না।

হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের দক্ষিণ আমেরিকা বিভাগের সাবেক পরিচালক বেঞ্জামিন গেডান বলেন, ‘ইরানকে এমন একটি পুতুল সরকারব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার ইচ্ছা ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক কম বাস্তবসম্মত। ভেনেজুয়েলা (মাদুরোর অধীনে থাকলেও) সরকার আগে থেকেই জ্বালানি বিষয়ে তাদের ঐতিহাসিক অংশীদার ও ওই অঞ্চলের মূল খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিল।’

বেঞ্জামিন গেডান বর্তমানে স্টিমসন সেন্টারের লাতিন আমেরিকা প্রকল্পের পরিচালক। তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি ভেবে নেয়, ভেনেজুয়েলার পর যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে ঘুরে হস্তক্ষেপ করতে পারবে এবং যেখানে আমাদের বিমানবাহী রণতরি থামে, সেখানেই দেলসি রদ্রিগেজের মতো একজনকে ক্ষমতায় বসাবে, তবে সেটা খানিকটা হাস্যকরই হবে।’

ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশটির পরবর্তী নেতা নির্বাচনে যুক্ত থাকার যে দাবি ট্রাম্প তুলেছেন, সেটি খুব সম্ভবত সেখানে এখনো বেঁচে থাকা কর্মকর্তারা দারুণভাবে প্রত্যাখান করবেন। কারণ, এটি তাদের কাছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে।

ইরানের অতীতে যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বৃহৎ পরিসরে বলতে গেলে, ১৯৭৯ সালে যে বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, তার সূত্রপাতও মূলত বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাবকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া গণ–অসন্তোষ থেকেই হয়েছিল।

সে সময়ে ইরানের শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকার মনে করত।

নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি

ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রকল্পবিষয়ক  প্রধান অ্যালেক্স ভাতানকা ইরানের নেতা নির্বাচনে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের চেষ্টাকে ‘একেবারেই বিভ্রান্তিকার’ বলে বর্ণনা করেছেন। উল্টো তিনি প্রশ্ন করেছেন, (ইরানে) ভেনেজুয়েলা ধাঁচের পরিস্থিতি আরোপ করার জন্য কোনো কার্যকর পরিকল্পনা তিনি করে রেখেছেন কি না।

ভাতানকা বলেন, ‘তিনি মূলত শিয়া মিলিট্যান্ট ইসলামিস্টদের তাঁর “মাগা” আন্দোলনে রূপান্তর করতে চাইছেন। এর চেয়ে সরকার পরিবর্তন বরং অনেক সহজ হতো।’

অ্যালেক্স ভাতানকা আরও বলেন, বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব ছিল। কারণ, খামেনির ঘনিষ্ঠ মহলের যাঁরা এখনো আছেন, তাঁরা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু এ জন্য আপনার একটি পরিকল্পনা তো থাকতে হবে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রকল্পবিষয়ক  প্রধান বলেন, ‘আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, শাসনব্যবস্থার ভেতরে কার সঙ্গে আপনি কাজ করতে পারবেন। এরপর, সেই দলের সঙ্গে মিলেমিশে—আপনি হয় এখন যাঁরা লড়াই করছেন তাদেরকে আপনার পক্ষ নিতে বোঝাতে পারেন, অথবা তাদের হত্যার হুমকি দিতে পারেন।’

ভাতানকা বলেন, ‘এভাবে কেউ শীর্ষ নেতা হিসেবে এগিয়ে আসতে পারেন, ভেনেজুয়েলায় দেলসি রদ্রিগেজ যা করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যা করছে, তা দেখে আমার মনে হচ্ছে না, তাদের তেমন কোনো পরিকল্পনা আছে। তারা হয়তো এটা বলে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা খামেনিকে হত্যা করেছি, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র অবশিষ্ট নেই, ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।’

এটি একটি উন্মুক্ত যুদ্ধ পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় শাসনব্যবস্থায় যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ কঠিন … পরদিন বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই তাঁদের হত্যা করা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে  ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের হাতে। অভিজাত এই বাহিনী ইরানের সামরিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশ তারা পরিচালনা করে।

দক্ষিণ আমেরিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের ‘দেলসি মডেল’ আবার প্রয়োগের আগ্রহের কারণ স্পষ্ট। ওয়াশিংটন মাদুরোর কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশকে কার্যকরভাবে দখলে নিতে পেরেছে। এটি ট্রাম্পকে সফল হওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা চাই: ট্রাম্প

গেডান বলেন, ‘আপনাকে কোনো যুদ্ধবিমান হারাতে হয়নি, কোনো মার্কিন সেনার ক্ষতি হয়নি। এমন একটি সরকার পেয়েছেন যারা খুবই শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল, কিন্তু এখন খুবই সহযোগী। এমন একটি দেশ পেয়েছেন, যার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যা [ট্রাম্পের মতে] এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুনভাবে ব্যবহারযোগ্য।’

কিন্তু হোয়াইট হাউসের সাবেক এই উপদেষ্টার মতে, ইরান অনেক দূরের দেশ এবং ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি অস্ত্রসজ্জিত। তা ছাড়া ট্রাম্পের কৌশল লাতিন আমেরিকায় কার্যকর হয়েছে কি না, সেটা বলার সময়ও এখনো হয়নি।

কেন এমনটা মনে করেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গেডান। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে এক বছর পরে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থান না করে, ভেনেজুয়েলাবাসী হয়তো ধীরে ধীরে আবার কিছু স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবে, কিছুটা স্বায়ত্তশাসন ফিরে পাবে।’

আর মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত মাদুরোর উত্তরসূরিদের পক্ষেও যেতে পারে। গেডান বলেন, ‘আজীবন পুতুল সরকার হয়ে থাকার কোনো পরিকল্পনা নিশ্চয়ই তাদের নেই।’

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন দেলসি রদ্রিগেজ

Read full story at source